নতুন বাংলাদেশ ও আগামীর রাষ্ট্রদর্শন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত দেড় দশকে অনেক চড়াই-উতরাই এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি উক্তি রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আশার সঞ্চার করেছে— “আই হ্যাভ এ প্ল্যান” (আমার একটি পরিকল্পনা আছে)।
এই একটি বাক্যের মাধ্যমে তিনি কেবল নিজের আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেননি, বরং গত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনে বিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্রকে পুনরায় সচল ও আধুনিক করার একটি সামগ্রিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এই পরিকল্পনা কোনো সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রকে খাদের কিনারা থেকে তুলে এনে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদার আসনে বসানোর দীর্ঘমেয়াদী ব্লু-প্রিন্ট।এটি স্বপ্নবিলাসী রাজনীতির বদলে ‘বাস্তব পরিকল্পনার রাজনীতি’র এক বলিষ্ঠ ঘোষণা।
ঐতিহাসিকভাবেই বাঙালির আবেগপ্রবণ মনে স্বপ্নের প্রভাব ব্যাপক। ‘সোনার বাংলা’ থেকে শুরু করে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’—প্রতিটি স্লোগানই মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে দেখা গেছে, স্বপ্নের পেছনে যদি নিরেট রোডম্যাপ বা বাস্তবায়নযোগ্য রূপরেখা না থাকে, তবে তা এক সময় ‘পপুলিস্ট’ সস্তা বুলিতে পরিণত হয়।

তারেক রহমান যখন বলেন “I have a plan”, তখন তিনি আসলে রাজনীতির মূল ফোকাস বা কেন্দ্রবিন্দুকে আবেগ থেকে সরিয়ে যৌক্তিকতার জমিতে নিয়ে আসছেন। তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন, রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো দৈব ঘটনা নয়; এটি একটি জটিল প্রকৌশল। এখানে আবেগ দিয়ে নয়, বরং অঙ্ক কষে এবং সমস্যা চিহ্নিত করে এগোতে হয়।
তারেক রহমানের এই ‘প্ল্যান’ বুঝতে হলে আমাদের বিএনপির অতীত শাসন আমলের সফলতার দিকে তাকাতে হবে। ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণ, উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু, প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করা এবং নারীর ক্ষমতায়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
২০০১-২০০৬ মেয়াদে তারেক রহমান নিজে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো কাছ থেকে দেখেছেন। তবে সেই সময়ে প্রশাসনের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা স্বার্থান্বেষী মহল এবং পরবর্তী সময়ে ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের চক্রান্তের কারণে কিছু বিতর্ক তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
আজকের তারেক রহমান সেই অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ এক পরিণত নেতা। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তিনি বিশ্ব রাজনীতি ও আধুনিক শাসনব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন। অতীতের ভুল-ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি এখন এমন এক রাষ্ট্র কাঠামোর কথা বলছেন, যেখানে ক্ষমতার এককেন্দ্রিক দাপট থাকবে না এবং দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রোধ করা হবে।
তারেক রহমানের এই পরিকল্পনার রাজনীতির প্রধান ভিত্তি হলো তাঁর ঘোষিত ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা। এটি কেবল নির্বাচনী ইশতেহার নয়, বরং একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর ব্লুপ্রিন্ট। এই পরিকল্পনায় তিনি কেবল বর্তমান সমস্যার সমাধান খুঁজছেন না, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে চাইছেন।

এই ৩১ দফার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো— ‘দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ’ এবং ‘প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য’। বাংলাদেশে ক্ষমতার যে অতি-কেন্দ্রীকরণ আমরা গত ১৫ বছরে দেখেছি, তা থেকে পরিত্রাণের জন্য এটি একটি যুগান্তকারী পরিকল্পনা। তারেক রহমান বুঝতে পেরেছেন, ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে যে কেউ স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে। তাই তাঁর পরিকল্পনাটি কোনো ব্যক্তিবিশেষের ক্ষমতায়ন নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতায়নের ওপর জোর দেয়।
তিনি মনে করেন, কেবল ভোটের রাজনীতি নয়, বরং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে দেশের বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মেধা কাজে লাগানো প্রয়োজন। এছাড়া, রাষ্ট্র ও সরকারের প্রধানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন এবং পর পর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার বিধান প্রবর্তন ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটিই হলো বাস্তবমুখী রাজনীতির পরিচয়।
তারেক রহমানের পরিকল্পনার আরেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘রেইনবো নেশন’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি বিদ্যমান, তা দেশের উন্নয়নকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বারবার জাতীয় ঐক্যের কথা বলছেন। তিনি এমন এক পরিকল্পনার কথা বলছেন যেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও রাষ্ট্রের মূল স্বার্থে সবাই এক হবে।
এটি কোনো অলীক কল্পনা নয়; তিনি এই পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে ‘জাতীয় সমঝোতা কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। বিভাজনের রাজনীতি দিয়ে যে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তাই তারেক রহমানের এই অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা দেশবাসীর মনে আশার আলো দেখাচ্ছে।
বিএনপির অতীত শাসনামলে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তারেক রহমান তাকে পূর্ণতা দিতে চান। তার পরিকল্পনায় বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে একটি স্বাধীন ‘জুডিশিয়াল কমিশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে কোনো পরিকল্পনা সফল হবে না।
তারেক রহমানের পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি কেবল প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলেন।তিনি বিশ্বাস করেন, দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী বোঝা নয়, বরং সম্পদ। তার পরিকল্পনায় কারিগরি শিক্ষা ও আইটি সেক্টরকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং এবং স্টার্টআপ সংস্কৃতির প্রসারে তিনি রাষ্ট্রীয় তহবিল ও বিশেষ প্রণোদনার কথা বলেছেন।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই তরুণরা চায় মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন। তারেক রহমান তাঁর পরিকল্পনায় বেকারত্ব দূরীকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি যখন তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং এবং কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে যুবশক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তোলার রোডম্যাপ দেন, তখন তা তরুণদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কারণ তিনি কেবল চাকরি দেওয়ার কথা বলছেন না, তিনি বলছেন এমন এক পরিবেশ তৈরির কথা যেখানে একজন তরুণ নিজেই উদ্যোক্তা হতে পারবে।
“I have a plan” বলার মাধ্যমে তিনি তরুণদের এই বার্তা দিচ্ছেন যে, রাজনীতির অর্থ কেবল মিছিল-মিটিং নয়; রাজনীতির অর্থ হলো বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের তরুণদের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের আমূল সংস্কার। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেধা যার কর্ম তার—এই নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে, যেখানে দলীয় আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতাকে বড় করে দেখা হবে।
বিএনপি আমলের শহীদ জিয়ার ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ যেমন কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছিল, তারেক রহমান সেই ধারাবাহিকতায় আধুনিক ও বাণিজ্যিক কৃষির ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং এসএমই (SME) খাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করার পরিকল্পনা করেছেন।
তারেক রহমানের ভাষ্যমতে, “দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গড়তে হলে কেবল শাস্তি দিয়ে হবে না, সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে।” তার পরিকল্পনায় সরকারি প্রতিটি খাতে অটোমেশন বা ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে যাতে মানুষের ভোগান্তি কমে এবং দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ হয়। তিনি লোকপাল (Ombudsman) নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব করেছেন, যা দেশের ইতিহাসে একটি বিরল সাহসী পদক্ষেপ।
সমালোচকরা প্রায়ই বিএনপির ২০০১-০৬ মেয়াদের কথা বলেন। কিন্তু সেই আমলেই বাংলাদেশ পরপর কয়েক বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছিল, বিদ্যুৎ ও সারের সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে এগিয়ে গিয়েছিল। তারেক রহমান সেই সফলতাকে ভিত্তি করে বর্তমানের আধুনিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে চান। তিনি জানেন, আজকের বিশ্ব ২০০৬ সালের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। তাই তার পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো বিষয়গুলোও স্থান পেয়েছে।
বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের অগ্রগতির মূলে ছিল দূরদর্শী পরিকল্পনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এলিজাবেথ ওয়ারেন যখন “I have a plan for that” স্লোগানটি ব্যবহার করেছিলেন, তখন তা নীতি-নির্ধারণী রাজনীতিতে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। তারেক রহমানও বাংলাদেশে সেই একই ঘরানার ‘পলিসি-ড্রিভেন’ বা নীতি-ভিত্তিক রাজনীতি প্রবর্তন করতে চাচ্ছেন। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক স্রোতধারা সম্পর্কে সম্যক অবগত। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে সম্পদ সীমিত, সেখানে পরিকল্পনাহীন কাজ মানেই সম্পদের অপচয়। তাই তারেক রহমানের পরিকল্পনার রাজনীতি সময়ের দাবি।
তারেক রহমানের ‘প্ল্যান’ কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের মুক্তি সনদ। একটি রাষ্ট্র যখন লুটেরা অর্থনীতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনায় পিষ্ট হয়, তখন মানুষের প্রয়োজন হয় একজন দূরদর্শী নেতার, যিনি পথ দেখাবেন। তারেক রহমান সেই নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
তার ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’—এই উক্তিটি আজ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে একটি আশার বাতিঘর। যেখানে প্রতিটি মানুষ কথা বলতে পারবে, ভোট দিতে পারবে এবং সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে। তিনি যে নতুন বাংলাদেশের কথা বলছেন, তা হবে এক উন্নত, সমৃদ্ধ এবং মানবিক বাংলাদেশ। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং ভবিষ্যতের আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে তারেক রহমান যে রূপরেখা দিয়েছেন, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষেই দক্ষিণ এশিয়ার একটি রোল মডেল রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
এখন সময় এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া। কারণ তারেক রহমানের পরিকল্পনা কেবল বিএনপির নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ফিরে পাওয়ার পরিকল্পনা। পরিশেষে বলা যায়, স্বপ্ন মানুষকে গন্তব্য দেখায়, কিন্তু সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন একটি মজবুত সেতু। সেই সেতুর নামই হলো ‘পরিকল্পনা’।
তারেক রহমানের “I Have a Plan” ঘোষণাটি বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় পরিবর্তনকারী এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এটি রাজনীতির সংজ্ঞাকে বদলে দিচ্ছে—মিথ্যা প্রতিশ্রুতি থেকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো, আর অস্পষ্ট ভিশন থেকে নির্দিষ্ট মিশন বা লক্ষ্যের দিকে যাত্রা।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।
Email : msislam.sumon@gmail.com



অনলাইনের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন