স্টাফ রিপোর্টার:: পাহাড়ে জুমের ফলন ভালো হলেও প্রতিবছরই কমছে জুম চাষের পরিমাণ। বিভিন্ন ফল ও সেগুন বাগান সম্প্রসারণ এবং জুমের জমির সংকোচনসহ নানা কারণে ঐতিহ্যবাহী এ চাষাবাদ থেকে সরে যাচ্ছেন অনেক চাষি। তবে এখনো জুমে ধান, আদা, হলুদ, ভুট্টা, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, তিল, মরিচসহ নানা ফসল আবাদ করে পরিবার ও জীবিকার চাহিদা মেটাচ্ছেন পাহাড়ের মানুষ।
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে পাহাড়ের ঢালে জুমের জমিতে বিভিন্ন ফসলের বীজ বপন করেন চাষিরা। তিন-চার মাস পর আশ্বিনের শুরুতে ধান পাকতে শুরু করে। মাসের শেষদিকে শুরু হয় পাকা ধান ঘরে তোলার উৎসব, যা চলে প্রায় মাসজুড়ে।
ধৈইল্যাতলীর জুম চাষি দুলাল ত্রিপুরা (৬১) বলেন, এবার জুমে ধান ছাড়াও আদা-হলুদ, চিনাল, ভুট্টা, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, আমিলা, তিল ও ছিকন মরিচ আবাদ করেছি। ধান তোলা শুরু হয়েছে। তেরাংতৈকালাই (রিসাং) ঝরনা এলাবার জুম চাষি সুনীল ত্রিপুরা জানান, দেড় আড়ি ধান পাশাপাশি মারফা, ভুট্টা, তিল, কলা লাগিয়েছি। ফলন দেখে ভালো মনে হচ্ছে।

দীঘিনালা উপজেলার সীমানাপাড়া এলাকার কার্বারি চয়ন ত্রিপুরা বলেন, আগে আমাদের দুর্গম এলাকায় অনেকেই জুম চাষ করতেন। এখন বিভিন্ন ফলের বাগান, সেগুন বাগান ও বসতবাড়ি হয়েছে। ফলে জুমের চাষের সংখ্যা কমেছে। সামনে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।
মাটিরাঙ্গা উপজেলার দুর্গম হাচুকপাড়া এলালার জুম চাষি দুলাল ত্রিপুরা, বিক্রম ত্রিপুরা ও অগ্নিলাল ত্রিপুরা জানান, মাটিও উর্বরতা নেই। প্রতি বছর এক জায়গায় চাষ করছি। তাই আগের মতো ফলন হয় না। এখন জুমে সার ও কীটনাশকও ব্যবহার করতে হচ্ছে। অথচ এক সময় এসবের প্রয়োজন ছিল না। জুম চাষিদের বাঁচার উপায় কী।
আজ ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ১৫০ হেক্টরে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। জুম চাষিদের দাবি, জুম বন উজাড়, মাটিক্ষয় ও জীববৈচিত্র্য হ্রাসের অন্যতম কারণ।
তবে স্থানীয় চাষিদের মতে, জুম চাষের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা কমছে। টিলায় স্থায়ী বাগান ও বসতি গড়ে ওঠায় ভবিষ্যতে জুমের জমি আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দীঘিনালার নয়মাইল এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য গণেশ ত্রিপুরা বলেন, প্রতি বছর জুম চাষ কমছে। তার কারণ হচ্ছে ফল বাগান বাড়ছে। জুম চাষিরা সরকারি কৃষিঋণও পান না। সরকার যদি ঋণ সহায়তা দিলে চাষিরা আরোও উৎসাহিত হয়ে আবাদ বাড়তে পারে।
মাটিরাঙ্গা উপজেলার ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড সাবেক মেম্বার শান্তিময় ত্রিপুরা জানান, জেলার মধ্যে মাটিরাঙ্গা উপজেলার আলুটিলা হৃদয়মেম্বার পাড়ায় এলাকায় সবচেয়ে বেশি জুম চাষ হয়। এখানে দেখা গেছে এক হাজার পরিবার মধ্যে তিনশ পরিবার জুম চাষ করেছে। মাটির আর্দ্রতা কমে গেছে, তাই ফলন কম হয়। এছাড়া জুমের জায়গায় আম, সেগুন বাগানসহ বিভিন্ন বাগান হওয়াতে জুম চাষ করার জায়গা নেই।
দুর্গম এলাকায় যারা জুম চাষের উপর নির্ভর তারা চাষ করতে না পারলে খাদ্য সংকটে পড়বে। জুম চাষিদের প্রতি সরকার যদি সুদৃষ্টি দেখে আমি মনে করি জুম চাষের আগ্রহ বাড়বে।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, জেলায় বিগত কয়েক বছর ধরেই জুম চাষের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। কৃষি বিভাগ নানাভাবে চাষিদের সহায়তা দিয়ে জুম চাষে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছে।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জুম চাষের গভীর সম্পর্ক থাকলেও জমির ব্যবহার পরিবর্তন, বাগান সম্প্রসারণ ও চাষিদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় এই প্রাচীন কৃষিপদ্ধতি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িরা জুম কেবল একটি কৃষিপদ্ধতি নয়। এটি জীবনযাপন, খাদ্য সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক, উৎসব, এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুম চাষ করে চলেছেন।
স্টাফ রিপোর্টার 





















