চট্টগ্রাম বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

ঢেঁড়শ চাষে লাখপতি হওয়ার স্বপ্ন

  • প্রতিবেদক
  • আপডেট : ০৮:৩৪:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬
  • ৪১ বার
৪০

স্টাফ রিপোর্টার:: অদম্য ইচ্ছা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কৃষিতে ভাগ্যের চাকা ঘোরাচ্ছেন খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা পৌরসভার চেয়ারম্যান পাড়ার বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন। মাত্র ৬ শতক জমিতে হাইব্রিড জাতের ঢেঁড়শ চাষ করে তিনি এখন সফলতার মুখ দেখছেন। ইতোমধ্যেই তিনি প্রায় ৮০ হাজার টাকার ঢেঁড়শ বিক্রি করেছেন।

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উপজেলায় মোট ৩১ হেক্টর জমিতে ঢেঁড়শের আবাদ করা হয়। এ সময় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩০ হেক্টর। এর মধ্যে নিরিবিলি জাতের ঢেঁড়শ চাষ করা হয় ২০ হেক্টর জমিতে এবং সুপ্রিয়া জাতের ঢেঁড়শ চাষ হয় ১০ হেক্টর জমিতে।

পরবর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢেঁড়শ চাষের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। এ বছরে মোট ৩২ হেক্টর জমিতে ঢেঁড়শের আবাদ করা হয় এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩১ হেক্টর। এর মধ্যে নিরিবিলি জাতের ঢেঁড়শ চাষ হয় ২১ হেক্টর জমিতে এবং সুপ্রিয়া জাতের ঢেঁড়শ চাষ করা হয় ১২ হেক্টর জমিতে।

ইব্রাহিম ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে জমি বন্ধক নিয়ে বাজার থেকে উন্নত মানের হাইব্রিড ঢেঁড়শ বীজ সংগ্রহ করেন। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের শ্রমকে পুঁজি করে তিনি গড়ে তুলেছেন এই সবুজ বাগান। বর্তমানে বাগানটি দেখাশোনা করছেন ইব্রাহিম নিজে, তার বাবা এবং ছোট ভাই। নিজেদের শ্রমে বাগান পরিচর্যা করায় অতিরিক্ত শ্রমিক খরচ লাগছে না, যা লাভের অঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইব্রাহিমের বাগান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ কেজি ঢেঁড়শ তোলা হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি ঢেঁড়শ ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও সবজির দাম ওঠানামা করে, তবুও ফলন ভালো হওয়ায় ইব্রাহিম বেশ লাভবান হচ্ছেন। তিনি জানান, গাছগুলো এখনো মাঝারি আকৃতির। গাছ যত বড় হবে, উৎপাদনও তত বৃদ্ধি পাবে। ইব্রাহিম আশা করছেন, গাছ পরিপূর্ণ হলে সামনের দিনগুলোতে বিক্রির পরিমাণ আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।

ঢেঁড়শ চাষের প্রধান অন্তরায় সম্পর্কে ইব্রাহিম জানান, কড়া রোদে এই গাছের পরিচর্যা করতে গেলে এক ধরনের ‘হুল’ বা সূক্ষ্ম রোঁয়া শরীরে লেগে চুলকানির সৃষ্টি হয়। এই ভয়ে অনেক সময় শ্রমিক পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। তবে ধৈর্য ও সঠিক সুরক্ষা নিয়ে কাজ করলে এটি বড় কোনো বাধা নয় বলেই তিনি মনে করেন।

আগামী ভাদ্র মাস পর্যন্ত এই বাগান থেকে ঢেঁড়শ সংগ্রহ করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই চাষাবাদ থেকেই বর্তমানে ইব্রাহিমের পুরো পরিবারের ভরণপোষণসহ যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ হচ্ছে। তার এই সাফল্য দেখে এলাকার অনেকেই এখন আধুনিক জাতের সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

ইব্রাহিমের বাবা আব্দুল করিম বলেন, “আমরা নিজেরাই পরিবার মিলে এই জমিতে কাজ করি। শুরুতে কিছুটা কষ্ট হলেও এখন ভালো ফলন পাচ্ছি। ঢেঁড়শের যত্ন নিয়মিত নিতে হয়, বিশেষ করে প্রতিদিন তুলতে না পারলে মান নষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহর রহমতে এখন পর্যন্ত যা উৎপাদন হয়েছে, তা দিয়ে সংসারের খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে। সামনে গাছগুলো আরও বড় হলে আয়ও বাড়বে বলে আশা করছি।”

ইব্রাহিমের ছোট ভাই বলেন, “ভাই ও বাবার সঙ্গে আমিও নিয়মিত বাগানে কাজ করি। সকালে ও বিকেলে গাছের পরিচর্যা আর ঢেঁড়শ তোলার কাজ করি। তবে বাজারে বিক্রির কাজটা আমিই করি। শুরুতে কিছুটা কষ্ট লাগলেও এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। নিজেরা কাজ করায় শ্রমিক খরচ বাঁচছে। প্রতিদিন ঢেঁড়শ বিক্রি করে যে আয় হচ্ছে, তা আমাদের পরিবারকে স্বচ্ছলভাবে চলতে সহায়তা করছে। সামনে ফলন আরও বাড়বে এমনটাই আশা করছি।”

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, “মাটিরাঙ্গার মাটি ও আবহাওয়া সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ইব্রাহিমের মতো তরুণ উদ্যোক্তারা আধুনিক ও হাইব্রিড জাতের ফসল চাষে এগিয়ে আসায় স্থানীয় কৃষি খাত সমৃদ্ধ হচ্ছে।

ঢেঁড়শ একটি লাভজনক ফসল, তবে নিয়মিত পরিচর্যা ও সঠিক সময়ে সংগ্রহ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকি। সঠিক পদ্ধতিতে চাষ করলে এ ধরনের উদ্যোগ আরও সফল হবে এবং কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।”

Download Photocard

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Al- Mamun

আলোচিত

ঢেঁড়শ চাষে লাখপতি হওয়ার স্বপ্ন

আপডেট : ০৮:৩৪:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬
৪০

স্টাফ রিপোর্টার:: অদম্য ইচ্ছা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কৃষিতে ভাগ্যের চাকা ঘোরাচ্ছেন খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা পৌরসভার চেয়ারম্যান পাড়ার বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন। মাত্র ৬ শতক জমিতে হাইব্রিড জাতের ঢেঁড়শ চাষ করে তিনি এখন সফলতার মুখ দেখছেন। ইতোমধ্যেই তিনি প্রায় ৮০ হাজার টাকার ঢেঁড়শ বিক্রি করেছেন।

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উপজেলায় মোট ৩১ হেক্টর জমিতে ঢেঁড়শের আবাদ করা হয়। এ সময় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩০ হেক্টর। এর মধ্যে নিরিবিলি জাতের ঢেঁড়শ চাষ করা হয় ২০ হেক্টর জমিতে এবং সুপ্রিয়া জাতের ঢেঁড়শ চাষ হয় ১০ হেক্টর জমিতে।

পরবর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢেঁড়শ চাষের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। এ বছরে মোট ৩২ হেক্টর জমিতে ঢেঁড়শের আবাদ করা হয় এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩১ হেক্টর। এর মধ্যে নিরিবিলি জাতের ঢেঁড়শ চাষ হয় ২১ হেক্টর জমিতে এবং সুপ্রিয়া জাতের ঢেঁড়শ চাষ করা হয় ১২ হেক্টর জমিতে।

ইব্রাহিম ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে জমি বন্ধক নিয়ে বাজার থেকে উন্নত মানের হাইব্রিড ঢেঁড়শ বীজ সংগ্রহ করেন। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের শ্রমকে পুঁজি করে তিনি গড়ে তুলেছেন এই সবুজ বাগান। বর্তমানে বাগানটি দেখাশোনা করছেন ইব্রাহিম নিজে, তার বাবা এবং ছোট ভাই। নিজেদের শ্রমে বাগান পরিচর্যা করায় অতিরিক্ত শ্রমিক খরচ লাগছে না, যা লাভের অঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইব্রাহিমের বাগান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ কেজি ঢেঁড়শ তোলা হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি ঢেঁড়শ ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও সবজির দাম ওঠানামা করে, তবুও ফলন ভালো হওয়ায় ইব্রাহিম বেশ লাভবান হচ্ছেন। তিনি জানান, গাছগুলো এখনো মাঝারি আকৃতির। গাছ যত বড় হবে, উৎপাদনও তত বৃদ্ধি পাবে। ইব্রাহিম আশা করছেন, গাছ পরিপূর্ণ হলে সামনের দিনগুলোতে বিক্রির পরিমাণ আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।

ঢেঁড়শ চাষের প্রধান অন্তরায় সম্পর্কে ইব্রাহিম জানান, কড়া রোদে এই গাছের পরিচর্যা করতে গেলে এক ধরনের ‘হুল’ বা সূক্ষ্ম রোঁয়া শরীরে লেগে চুলকানির সৃষ্টি হয়। এই ভয়ে অনেক সময় শ্রমিক পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। তবে ধৈর্য ও সঠিক সুরক্ষা নিয়ে কাজ করলে এটি বড় কোনো বাধা নয় বলেই তিনি মনে করেন।

আগামী ভাদ্র মাস পর্যন্ত এই বাগান থেকে ঢেঁড়শ সংগ্রহ করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই চাষাবাদ থেকেই বর্তমানে ইব্রাহিমের পুরো পরিবারের ভরণপোষণসহ যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ হচ্ছে। তার এই সাফল্য দেখে এলাকার অনেকেই এখন আধুনিক জাতের সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

ইব্রাহিমের বাবা আব্দুল করিম বলেন, “আমরা নিজেরাই পরিবার মিলে এই জমিতে কাজ করি। শুরুতে কিছুটা কষ্ট হলেও এখন ভালো ফলন পাচ্ছি। ঢেঁড়শের যত্ন নিয়মিত নিতে হয়, বিশেষ করে প্রতিদিন তুলতে না পারলে মান নষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহর রহমতে এখন পর্যন্ত যা উৎপাদন হয়েছে, তা দিয়ে সংসারের খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে। সামনে গাছগুলো আরও বড় হলে আয়ও বাড়বে বলে আশা করছি।”

ইব্রাহিমের ছোট ভাই বলেন, “ভাই ও বাবার সঙ্গে আমিও নিয়মিত বাগানে কাজ করি। সকালে ও বিকেলে গাছের পরিচর্যা আর ঢেঁড়শ তোলার কাজ করি। তবে বাজারে বিক্রির কাজটা আমিই করি। শুরুতে কিছুটা কষ্ট লাগলেও এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। নিজেরা কাজ করায় শ্রমিক খরচ বাঁচছে। প্রতিদিন ঢেঁড়শ বিক্রি করে যে আয় হচ্ছে, তা আমাদের পরিবারকে স্বচ্ছলভাবে চলতে সহায়তা করছে। সামনে ফলন আরও বাড়বে এমনটাই আশা করছি।”

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, “মাটিরাঙ্গার মাটি ও আবহাওয়া সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ইব্রাহিমের মতো তরুণ উদ্যোক্তারা আধুনিক ও হাইব্রিড জাতের ফসল চাষে এগিয়ে আসায় স্থানীয় কৃষি খাত সমৃদ্ধ হচ্ছে।

ঢেঁড়শ একটি লাভজনক ফসল, তবে নিয়মিত পরিচর্যা ও সঠিক সময়ে সংগ্রহ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকি। সঠিক পদ্ধতিতে চাষ করলে এ ধরনের উদ্যোগ আরও সফল হবে এবং কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।”

Download Photocard