চট্টগ্রাম সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাজীপুরে আলোচনায় আট নারীর মাদকের সম্রাজ্য

  • প্রতিবেদক
  • আপডেট : ০২:০২:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪৪ বার

স্টাফ রিপোর্টার:: রাজধানীর কাছাকাছি অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা—সব মিলিয়ে গাজীপুরের টঙ্গী দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত। টঙ্গীর হাজীর মাজার, ব্যাংক মাঠ, কেরানীরটেক, এরশাদ নগরসহ বিভিন্ন বস্তিতে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব এলাকায় ছোট-বড় মাদক কারবারিদের পাশাপাশি নারীদের একটি অংশও সক্রিয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মাদক বিক্রির নেটওয়ার্ক। তাঁদের সহযোগী হিসেবে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় আরও অনেক নারী কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তির বাসিন্দা মোমেলা বেগমকে বড় মাদক কারবারিদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। গাঁজা দিয়ে শুরু করে পরে ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবার কারবারে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

মোমেলা বেগমের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় তাঁর নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে বাড়ি, জমি ও যানবাহন রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। গত বছরের ২ নভেম্বর তাঁকে ইয়াবা ও হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে।

ব্যাংক মাঠ বস্তির আরেক আলোচিত নারী মাদক কারবারি ময়না খাতুন। তাঁর বিরুদ্ধেও একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। ময়নার মেয়ে নার্গিস ও পুত্রবধূ রোজীর বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে।

ময়না খাতুনের ভাই শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধেও ইয়াবা পরিবহনের অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানা গেছে। ময়নার ছেলে তাজুল ইসলাম তাজুর বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত মামলা রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মাদক কারবারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে গাজীপুর ও মাদারীপুরে সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে।

টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তিতে ‘বড় আপা’ নামে পরিচিত আফরিনা আক্তারকেও স্থানীয়ভাবে বড় মাদক কারবারি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আগে ফেনসিডিলের পাইকারি কারবার এবং বর্তমানে ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে তাঁর স্বামী ও ভাই সহযোগিতা করেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

কেরানীরটেক বস্তিতে সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে কুলসুমের বিরুদ্ধে। একসময় আর্থিকভাবে অসচ্ছল থাকলেও মাদক কারবারের মাধ্যমে তাঁর সম্পদ বেড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। রেলওয়ের জায়গা দখল করে মাদক বিক্রির স্থান তৈরির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সম্প্রতি তাঁর বোন নার্গিসকে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।

একই এলাকার আরেক নারী কারবারি হিসেবে কারিমা বেগমের নামও উঠে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। গত ১৮ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। দীর্ঘদিনের মাদক কারবারের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

টঙ্গীর বাইরে গাজীপুর মহানগরের কাশিমপুর ও লক্ষ্মীপুরা এলাকাতেও নারী মাদক কারবারিদের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। কাশিমপুরের নয়াপাড়া এলাকার ডালিয়া বেগমের জীবনযাত্রায় কয়েক বছরের ব্যবধানে বড় পরিবর্তন এসেছে বলে স্থানীয়রা জানান। আগে অন্যের বাড়িতে কাজ করলেও বর্তমানে ওই এলাকায় তাঁর পরিবারের একাধিক বাড়ি রয়েছে বলে জানা গেছে।

লক্ষ্মীপুরা এলাকার তাহমিনা ও আশাকেও মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসার মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব নারী একা নন; তাঁদের ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে আরও অনেক নারী ও পুরুষ কাজ করেন। কেউ মাদক সংগ্রহ, কেউ পরিবহন, আবার কেউ খুচরা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. বেলায়াত হোসেন বলেন, মহানগরের বিভিন্ন বস্তিতে মাদক কারবার বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। গত আট মাসে এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং অনেক কারবারিকে আটক করা হয়েছে।

তিনি জানান, সম্প্রতি কিছু বস্তিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় কয়েকটি মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করে সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে। টঙ্গীকে মাদকমুক্ত করতে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বস্তিতে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হলেও স্থানীয়দের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি কারবারের অর্থের উৎস, পৃষ্ঠপোষকতা এবং সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

Download Photocard

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Al- Mamun