চট্টগ্রাম সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

বর্ষার স্পর্শে প্রাণ ফিরলো রাঙামাটির পাহাড়ি ঝর্ণায়

  • প্রতিবেদক
  • আপডেট : ১১:২৩:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
  • ২১ বার
২৫

স্টাফ রিপোর্টার:: নীল জলরাশিতে ভরা কাপ্তাই হ্রদ, সবুজে ঘেরা পাহাড় আর গহীন অরণ্য-প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে গড়ে ওঠা এক অনন্য জনপদের নাম রাঙামাটি। সুউচ্চ পাহাড় আর বিশাল জলরাশির বৈচিত্র্য যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। আর বর্ষা এলেই সেই সৌন্দর্য পায় নতুন মাত্রা। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসে অসংখ্য ঝর্ণা ও জলপ্রপাত। প্রাণ ফিরে পায় গহীন অরণ্যের হারিয়ে যাওয়া জলধারা। সেই রূপ দেখতে এ সময় দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা।

‘পাহাড়ের রানী’ হিসেবে পরিচিত রাঙামাটি কেবল কাপ্তাই হ্রদ কিংবা ঝুলন্ত সেতুর জন্যই নয়, এর প্রকৃত সৌন্দর্যের বড় একটি অংশ লুকিয়ে আছে দুর্গম পাহাড় ও গহীন অরণ্যে। বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জেগে ওঠে নাম জানা-অজানা অসংখ্য ঝর্ণা। বৃষ্টির পানি পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে তৈরি করে ছোট-বড় জলপ্রপাত। ঝর্ণার অবিরাম জলধারা আর পাহাড়ি সবুজের মেলবন্ধনে সৃষ্টি হয় এক মায়াবী পরিবেশ।

ছোট-বড় পাহাড়, উপত্যকা ও কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি রাঙামাটিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রার নান্দনিকতা। কোথাও খাড়া পাহাড়, কোথাও সরু ঝিরিপথ, আবার কোথাও ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। বর্ষায় পাহাড়ি মেঘ এসে যখন এসব উচ্চতা ঢেকে ফেলে, তখন প্রকৃতি যেন আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। পাহাড়ের গহীন নীরবতা ভেঙে ঝর্ণার পানির কলতান পুরো বনাঞ্চলকে পরিণত করে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের রাজ্যে।

কাপ্তাই হ্রদের বুক চিরে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সুবলংয়ের দিকে এগোতে থাকলে দূর থেকেই চোখে পড়ে বিশাল পাহাড়। সেই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছে ঐতিহ্যবাহী সুবলং ঝর্ণা। বর্ষায় পূর্ণ যৌবন ফিরে পায় ঝর্ণাটি। পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসা জলধারা চারপাশে ছড়িয়ে দেয় শীতল জলকণা। বোটে করে তুলনামূলক সহজে পৌঁছানো যায় বলে পর্যটকদের কাছে সুবলং বরাবরই জনপ্রিয়।

রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের গহীন পাহাড়ে অবস্থিত ধুপপানি ঝর্ণা। স্থানীয় তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ‘ধুপ’ শব্দের অর্থ সাদা; অর্থাৎ ধুপপানি মানে সাদা পানির ঝর্ণা।

ধুপপানিতে পৌঁছানোর পথই যেন আলাদা এক অ্যাডভেঞ্চার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাড়া পাহাড়, ঝিরিপথ ও পিচ্ছিল পাথর পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় ঝর্ণার কাছে। সেখানে শত ফুট উঁচু পাহাড় থেকে দুধসাদা ফেনিল জলধারা আছড়ে পড়ে নিচে। ঝর্ণার ভেতরের দিকে থাকা প্রাকৃতিক গুহাটি এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গুহার ভেতর থেকে ঝর্ণার পানির পর্দা দেখার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের।

কাপ্তাই ও বিলাইছড়ির গহীন অরণ্যে লুকিয়ে থাকা মুপ্পোছড়া ও ন’কাটাছড়া ঝর্ণা প্রকৃতির নিজস্ব গোপন চিত্রকর্মের মতো। ট্র্যাকিংপ্রেমীদের কাছে এসব ঝর্ণা বেশ জনপ্রিয়। পাথুরে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা, চারপাশের ঘন সবুজ বন আর নির্জন পরিবেশ মিলিয়ে এসব ঝর্ণা হয়ে উঠেছে ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের কেন্দ্র।

বিলাইছড়িতে রয়েছে গাছকাটা ঝর্ণা, শতপাপড়ি ঝর্ণা ও সাইনপুকুর এলাকার আরও কয়েকটি ছোট-বড় জলপ্রপাত। অনেকগুলোর পরিচিতি এখনও সীমিত স্থানীয় পর্যায়ে। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের কাছে এসব দুর্গম ঝর্ণা নতুন নতুন রোমাঞ্চের সন্ধান দিচ্ছে।

রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাউখালী উপজেলার ঘাগড়ার কলাবাগান এলাকায় রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ঘাগড়া ঝর্ণা, যা কলাবাগান বা তৈমা ঝর্ণা নামেও পরিচিত। বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিতে ঝর্ণাটি ফিরে পেয়েছে পূর্ণ যৌবন। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা জলধারা আর চারপাশের সবুজ অরণ্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন পর্যটকরা।

মূল ঝর্ণায় পৌঁছানোর আগে পথেই দেখা মেলে আরও তিন-চারটি ছোট-বড় ঝর্ণার। পাহাড়ি ছড়া ও নুড়ি পাথর মাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথটি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের বাড়তি আনন্দ দেয়। এ ছাড়া রাঙামাটির সাজেকে হাজাছড়া ঝর্ণা, বাঘাইছড়ির সিজক ঝর্ণা ও লংগদুর শিলাছড়া ঝর্ণাও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

রাঙামাটির দুর্গম ঝর্ণাগুলোতে জনবসতি কম হওয়ায় পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিবন্ধিত গাইড হিসেবে কাজে লাগানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে যেমন স্থানীয়দের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, তেমনি পর্যটকরাও দুর্গম এলাকায় তুলনামূলক নিরাপদে চলাচল করতে পারছেন।

বিলাইছড়ির গাছকাটাছড়া, মুপ্পোছড়া ও ধুপপানি ঝর্ণাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কমিউনিটি বেইজড ইকোট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট কমিটি। ২০২১ সালে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ২১ সদস্যের এই কমিটির মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ৪০ জন গাইড কাজ করছেন। প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি পর্যটন প্রসারে কাজ করছেন তারা।

কমিটির সাধারণ সম্পাদক আথুই মারমা জানান, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কমিটি গঠন করা হয়নি। পর্যটকরা আগে থেকেই এসব এলাকায় আসতেন। তবে পাহাড়ের প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি কমাতে এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাইড ও কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সাধারণত ১০ জনের একটি পর্যটক দলের জন্য একজন গাইড দেওয়া হয়। এজন্য গাইড ফি হিসেবে ১ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তবে পর্যটকদের অনুরোধে কখনো একজন গাইডের সঙ্গে ১৪-১৫ জনও যেতে পারেন।

আথুই মারমার মতে, বছরের তিন থেকে চার মাস পর্যটকদের জন্য ঝর্ণাগুলো উপযোগী থাকে। এই সময়ে পর্যটকরা যাতে নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারেন এবং ঝর্ণার পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়, সেটিই তাদের মূল লক্ষ্য। তবে দুর্গম পাহাড়ি পথে কিছু জায়গায় সিঁড়ি নির্মাণ করা হলে পর্যটকদের চলাচল আরও সহজ হবে।

দুর্গম ঝর্ণাগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পরিবেশের ওপর চাপও। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেটসহ নানা ধরনের বর্জ্য দূষিত করছে ঝর্ণা ও আশপাশের পরিবেশ। ফলে অপরিকল্পিত পর্যটনের কারণে এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হুমকির মুখে পড়ছে।

কোথাও কোথাও স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তাবাহিনীর নজরদারিও রয়েছে। বিশেষ করে ধুপপানি ঝর্ণায় যাওয়ার ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন ও নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে পরিচয়পত্র ও ছবি জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতায় স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত ট্যুরিস্ট গাইডও কাজ করছেন। ধুপপানি, গাছকাটা ও মুপ্পোছড়ার মতো দুর্গম ঝর্ণায় যেতে স্থানীয় গাইডের সহযোগিতা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশবিদ ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃতির ক্ষতি না করে কাঠ বা বাঁশের পরিবেশবান্ধব বিশ্রামাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দুর্গম এলাকায় জরুরি যোগাযোগ ও ফার্স্ট এইড পয়েন্ট স্থাপন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইডের মাধ্যমে পর্যটকদের চলাচল নিশ্চিত করা গেলে প্রকৃতি রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানও বাড়বে।

রাঙামাটির দুর্গম ঝর্ণাগুলোতে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা সাধারণ ভ্রমণের মতো নয়। কোথাও সড়কপথে দীর্ঘ যাত্রার পর শুরু হয় হাঁটা, আবার কোথাও বোটে করে যেতে হয় পাহাড়ের কাছাকাছি। এরপর খাড়া ও পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ, ঝিরিপথ, নুড়ি-পাথর আর কখনো উরুসমান পানি পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।

পথে জোঁকের উপদ্রব, হঠাৎ পাহাড়ি ঢল বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডের আশঙ্কা এবং ঘন জঙ্গলের পরিবেশ ভ্রমণের রোমাঞ্চ আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে এই কষ্ট পেরিয়ে ঝর্ণার সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্তে সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়।

এই ভ্রমণ শুধু ঝর্ণা দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যাত্রাপথে পাহাড়ের ঢালে দেখা মেলে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মাচাংঘর। পাহাড়ি জনপদের সহজ-সরল জীবনযাপন, আতিথেয়তা ও স্থানীয় খাবারের স্বাদ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

বর্ষায় সুবলং, ধুপপানি, মুপ্পোছড়া, গাছকাটাসহ রাঙামাটির বিভিন্ন ঝর্ণা বৃষ্টির পানি পেয়ে প্রবল বেগে গর্জন করতে করতে পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসে। দূর থেকে ভেসে আসা জলপতনের শব্দ, কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জল আর চারপাশের সতেজ সবুজ প্রকৃতি পর্যটকদের মুগ্ধ করে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। হ্রদের দূরবর্তী দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাতায়াতের জন্য আধুনিক ও নিরাপদ নৌযানের ঘাটতি রয়েছে। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল এবং সড়ক যোগাযোগও দুর্গম। ফলে কোনো পর্যটক অসুস্থ বা আহত হলে দ্রুত উদ্ধার করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

তারপরও যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির নিঃশব্দতার মাঝে হারিয়ে যেতে চাইলে রাঙামাটির পাহাড়ি ঝর্ণার বিকল্প নেই। কাপ্তাই হ্রদের নীল জল, পাহাড়ের সবুজ আর ঝর্ণার শুভ্র জলধারার মেলবন্ধন বর্ষায় রাঙামাটিকে দেয় এক অনন্য রূপ। দুর্গম পথ পেরিয়ে ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে হিমশীতল জলকণার স্পর্শ পাওয়ার অনুভূতি ভ্রমণকারীর মনে তৈরি করে দীর্ঘস্থায়ী এক স্মৃতি।

প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন। প্রকৃতিকে ভালোবেসে, পাহাড়ের পরিবেশ রক্ষা করে পর্যটন পরিচালনা করা গেলে রাঙামাটির ঝর্ণাগুলো ভবিষ্যতেও হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটন গন্তব্য।

Download Photocard

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Al- Mamun

বর্ষার স্পর্শে প্রাণ ফিরলো রাঙামাটির পাহাড়ি ঝর্ণায়

আপডেট : ১১:২৩:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
২৫

স্টাফ রিপোর্টার:: নীল জলরাশিতে ভরা কাপ্তাই হ্রদ, সবুজে ঘেরা পাহাড় আর গহীন অরণ্য-প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে গড়ে ওঠা এক অনন্য জনপদের নাম রাঙামাটি। সুউচ্চ পাহাড় আর বিশাল জলরাশির বৈচিত্র্য যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। আর বর্ষা এলেই সেই সৌন্দর্য পায় নতুন মাত্রা। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসে অসংখ্য ঝর্ণা ও জলপ্রপাত। প্রাণ ফিরে পায় গহীন অরণ্যের হারিয়ে যাওয়া জলধারা। সেই রূপ দেখতে এ সময় দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা।

‘পাহাড়ের রানী’ হিসেবে পরিচিত রাঙামাটি কেবল কাপ্তাই হ্রদ কিংবা ঝুলন্ত সেতুর জন্যই নয়, এর প্রকৃত সৌন্দর্যের বড় একটি অংশ লুকিয়ে আছে দুর্গম পাহাড় ও গহীন অরণ্যে। বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জেগে ওঠে নাম জানা-অজানা অসংখ্য ঝর্ণা। বৃষ্টির পানি পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে তৈরি করে ছোট-বড় জলপ্রপাত। ঝর্ণার অবিরাম জলধারা আর পাহাড়ি সবুজের মেলবন্ধনে সৃষ্টি হয় এক মায়াবী পরিবেশ।

ছোট-বড় পাহাড়, উপত্যকা ও কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি রাঙামাটিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রার নান্দনিকতা। কোথাও খাড়া পাহাড়, কোথাও সরু ঝিরিপথ, আবার কোথাও ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। বর্ষায় পাহাড়ি মেঘ এসে যখন এসব উচ্চতা ঢেকে ফেলে, তখন প্রকৃতি যেন আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। পাহাড়ের গহীন নীরবতা ভেঙে ঝর্ণার পানির কলতান পুরো বনাঞ্চলকে পরিণত করে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের রাজ্যে।

কাপ্তাই হ্রদের বুক চিরে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সুবলংয়ের দিকে এগোতে থাকলে দূর থেকেই চোখে পড়ে বিশাল পাহাড়। সেই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছে ঐতিহ্যবাহী সুবলং ঝর্ণা। বর্ষায় পূর্ণ যৌবন ফিরে পায় ঝর্ণাটি। পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসা জলধারা চারপাশে ছড়িয়ে দেয় শীতল জলকণা। বোটে করে তুলনামূলক সহজে পৌঁছানো যায় বলে পর্যটকদের কাছে সুবলং বরাবরই জনপ্রিয়।

রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের গহীন পাহাড়ে অবস্থিত ধুপপানি ঝর্ণা। স্থানীয় তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ‘ধুপ’ শব্দের অর্থ সাদা; অর্থাৎ ধুপপানি মানে সাদা পানির ঝর্ণা।

ধুপপানিতে পৌঁছানোর পথই যেন আলাদা এক অ্যাডভেঞ্চার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাড়া পাহাড়, ঝিরিপথ ও পিচ্ছিল পাথর পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় ঝর্ণার কাছে। সেখানে শত ফুট উঁচু পাহাড় থেকে দুধসাদা ফেনিল জলধারা আছড়ে পড়ে নিচে। ঝর্ণার ভেতরের দিকে থাকা প্রাকৃতিক গুহাটি এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গুহার ভেতর থেকে ঝর্ণার পানির পর্দা দেখার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের।

কাপ্তাই ও বিলাইছড়ির গহীন অরণ্যে লুকিয়ে থাকা মুপ্পোছড়া ও ন’কাটাছড়া ঝর্ণা প্রকৃতির নিজস্ব গোপন চিত্রকর্মের মতো। ট্র্যাকিংপ্রেমীদের কাছে এসব ঝর্ণা বেশ জনপ্রিয়। পাথুরে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা, চারপাশের ঘন সবুজ বন আর নির্জন পরিবেশ মিলিয়ে এসব ঝর্ণা হয়ে উঠেছে ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের কেন্দ্র।

বিলাইছড়িতে রয়েছে গাছকাটা ঝর্ণা, শতপাপড়ি ঝর্ণা ও সাইনপুকুর এলাকার আরও কয়েকটি ছোট-বড় জলপ্রপাত। অনেকগুলোর পরিচিতি এখনও সীমিত স্থানীয় পর্যায়ে। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের কাছে এসব দুর্গম ঝর্ণা নতুন নতুন রোমাঞ্চের সন্ধান দিচ্ছে।

রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাউখালী উপজেলার ঘাগড়ার কলাবাগান এলাকায় রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ঘাগড়া ঝর্ণা, যা কলাবাগান বা তৈমা ঝর্ণা নামেও পরিচিত। বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিতে ঝর্ণাটি ফিরে পেয়েছে পূর্ণ যৌবন। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা জলধারা আর চারপাশের সবুজ অরণ্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন পর্যটকরা।

মূল ঝর্ণায় পৌঁছানোর আগে পথেই দেখা মেলে আরও তিন-চারটি ছোট-বড় ঝর্ণার। পাহাড়ি ছড়া ও নুড়ি পাথর মাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথটি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের বাড়তি আনন্দ দেয়। এ ছাড়া রাঙামাটির সাজেকে হাজাছড়া ঝর্ণা, বাঘাইছড়ির সিজক ঝর্ণা ও লংগদুর শিলাছড়া ঝর্ণাও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

রাঙামাটির দুর্গম ঝর্ণাগুলোতে জনবসতি কম হওয়ায় পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিবন্ধিত গাইড হিসেবে কাজে লাগানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে যেমন স্থানীয়দের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, তেমনি পর্যটকরাও দুর্গম এলাকায় তুলনামূলক নিরাপদে চলাচল করতে পারছেন।

বিলাইছড়ির গাছকাটাছড়া, মুপ্পোছড়া ও ধুপপানি ঝর্ণাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কমিউনিটি বেইজড ইকোট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট কমিটি। ২০২১ সালে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ২১ সদস্যের এই কমিটির মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ৪০ জন গাইড কাজ করছেন। প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি পর্যটন প্রসারে কাজ করছেন তারা।

কমিটির সাধারণ সম্পাদক আথুই মারমা জানান, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কমিটি গঠন করা হয়নি। পর্যটকরা আগে থেকেই এসব এলাকায় আসতেন। তবে পাহাড়ের প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি কমাতে এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাইড ও কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সাধারণত ১০ জনের একটি পর্যটক দলের জন্য একজন গাইড দেওয়া হয়। এজন্য গাইড ফি হিসেবে ১ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তবে পর্যটকদের অনুরোধে কখনো একজন গাইডের সঙ্গে ১৪-১৫ জনও যেতে পারেন।

আথুই মারমার মতে, বছরের তিন থেকে চার মাস পর্যটকদের জন্য ঝর্ণাগুলো উপযোগী থাকে। এই সময়ে পর্যটকরা যাতে নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারেন এবং ঝর্ণার পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়, সেটিই তাদের মূল লক্ষ্য। তবে দুর্গম পাহাড়ি পথে কিছু জায়গায় সিঁড়ি নির্মাণ করা হলে পর্যটকদের চলাচল আরও সহজ হবে।

দুর্গম ঝর্ণাগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পরিবেশের ওপর চাপও। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেটসহ নানা ধরনের বর্জ্য দূষিত করছে ঝর্ণা ও আশপাশের পরিবেশ। ফলে অপরিকল্পিত পর্যটনের কারণে এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হুমকির মুখে পড়ছে।

কোথাও কোথাও স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তাবাহিনীর নজরদারিও রয়েছে। বিশেষ করে ধুপপানি ঝর্ণায় যাওয়ার ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন ও নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে পরিচয়পত্র ও ছবি জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতায় স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত ট্যুরিস্ট গাইডও কাজ করছেন। ধুপপানি, গাছকাটা ও মুপ্পোছড়ার মতো দুর্গম ঝর্ণায় যেতে স্থানীয় গাইডের সহযোগিতা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশবিদ ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃতির ক্ষতি না করে কাঠ বা বাঁশের পরিবেশবান্ধব বিশ্রামাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দুর্গম এলাকায় জরুরি যোগাযোগ ও ফার্স্ট এইড পয়েন্ট স্থাপন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইডের মাধ্যমে পর্যটকদের চলাচল নিশ্চিত করা গেলে প্রকৃতি রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানও বাড়বে।

রাঙামাটির দুর্গম ঝর্ণাগুলোতে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা সাধারণ ভ্রমণের মতো নয়। কোথাও সড়কপথে দীর্ঘ যাত্রার পর শুরু হয় হাঁটা, আবার কোথাও বোটে করে যেতে হয় পাহাড়ের কাছাকাছি। এরপর খাড়া ও পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ, ঝিরিপথ, নুড়ি-পাথর আর কখনো উরুসমান পানি পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।

পথে জোঁকের উপদ্রব, হঠাৎ পাহাড়ি ঢল বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডের আশঙ্কা এবং ঘন জঙ্গলের পরিবেশ ভ্রমণের রোমাঞ্চ আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে এই কষ্ট পেরিয়ে ঝর্ণার সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্তে সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়।

এই ভ্রমণ শুধু ঝর্ণা দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যাত্রাপথে পাহাড়ের ঢালে দেখা মেলে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মাচাংঘর। পাহাড়ি জনপদের সহজ-সরল জীবনযাপন, আতিথেয়তা ও স্থানীয় খাবারের স্বাদ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

বর্ষায় সুবলং, ধুপপানি, মুপ্পোছড়া, গাছকাটাসহ রাঙামাটির বিভিন্ন ঝর্ণা বৃষ্টির পানি পেয়ে প্রবল বেগে গর্জন করতে করতে পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসে। দূর থেকে ভেসে আসা জলপতনের শব্দ, কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জল আর চারপাশের সতেজ সবুজ প্রকৃতি পর্যটকদের মুগ্ধ করে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। হ্রদের দূরবর্তী দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাতায়াতের জন্য আধুনিক ও নিরাপদ নৌযানের ঘাটতি রয়েছে। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল এবং সড়ক যোগাযোগও দুর্গম। ফলে কোনো পর্যটক অসুস্থ বা আহত হলে দ্রুত উদ্ধার করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

তারপরও যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির নিঃশব্দতার মাঝে হারিয়ে যেতে চাইলে রাঙামাটির পাহাড়ি ঝর্ণার বিকল্প নেই। কাপ্তাই হ্রদের নীল জল, পাহাড়ের সবুজ আর ঝর্ণার শুভ্র জলধারার মেলবন্ধন বর্ষায় রাঙামাটিকে দেয় এক অনন্য রূপ। দুর্গম পথ পেরিয়ে ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে হিমশীতল জলকণার স্পর্শ পাওয়ার অনুভূতি ভ্রমণকারীর মনে তৈরি করে দীর্ঘস্থায়ী এক স্মৃতি।

প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন। প্রকৃতিকে ভালোবেসে, পাহাড়ের পরিবেশ রক্ষা করে পর্যটন পরিচালনা করা গেলে রাঙামাটির ঝর্ণাগুলো ভবিষ্যতেও হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটন গন্তব্য।

Download Photocard