
মো.এনামুল হক,স্টাফ রিপোর্টার:: উঠানের একপাশে বড় পাতিলে ভাত রান্না হচ্ছে। সাধারণ চোখে মনে হতে পারে কোনো মেজবানির আয়োজন। কিন্তু এই ভাত রান্না হচ্ছে একটি গরুর জন্য। আর সেই গরুটির নাম ‘সম্রাট’। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা বাজারের কাছে শেঠ এগ্রো ফার্মস লিমিটেড-এ বড় হয়ে উঠছে এই অসাধারণ ষাঁড়। ফ্রিজিয়ান জাতের সম্রাট এখন পুরো এলাকায় আলোচনার ঝড় তুলেছে।
প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মানুষ ভিড় করছেন শুধু এক নজর দেখার জন্য। কালো-সাদা মিশ্রিত তার বিশাল দেহ আর কপালের নান্দনিক ছাপ দেখলে চোখ ফেরানো যায় না। প্রায় আড়াই বছর আগে চট্টগ্রামের একটি খামার থেকে আনা হয়েছিল সম্রাটকে। বর্তমানে তার ওজন প্রায় ১ হাজার ১০০ কেজি। খামার কর্তৃপক্ষ এর দাম হাঁকিয়েছেন ১২ লাখ টাকা। আসন্ন ঈদুল আজহায় চট্টগ্রামের কাজীর ডেইরি বড় গরুর হাটে তোলা হবে এই দানবাকৃতির ষাঁড়কে।
প্রাকৃতিক যত্নে বেড়ে ওঠা রাজা শেঠ এগ্রো ফার্মসে বর্তমানে তিনটি গয়াল, তিনটি মহিষসহ মোট ৩২টি পশু রয়েছে। তবে সবাইকে ছাপিয়ে সবচেয়ে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ‘সম্রাট’। খামার সূত্র জানায়, সম্রাটকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করা হয়েছে। দানাদার খাবার, খড়, খৈল, ভুষি, ভুট্টার ঘাসের পাশাপাশি তার প্রিয় খাবার আতপ চালের ভাত। প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার টাকার খাবার খায় সে।

তিনজন শ্রমিক সার্বক্ষণিক তার দেখাশোনা করেন। প্রতিদিন তিন বেলা গোসল করানো হয়। ফলে তার স্বাস্থ্য যেমন উজ্জ্বল, স্বভাবও অত্যন্ত শান্ত ও নম্র। শেঠ এগ্রো ফার্মস লিমিটেডের শ্রমিক জুলহাস বলেন, “সম্রাটকে ঘিরে আমরা দিন-রাত পরিশ্রম করেছি। প্রায় আড়াই বছর ধরে মাটিরাঙ্গার এই খামারে তাকে সন্তানের মতো যত্ন করে বড় করে তুলেছি। আতব চালের ভাত তার খুবই পছন্দের খাবার। প্রতিদিন আমি নিজ হাতে তার জন্য ভাত রান্না করি।
তাকে মোটাতাজাকরণের জন্য কোনো ধরনের কৃত্রিম ওষুধ বা ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা হয়নি। সম্পূর্ণ দেশীয় ও প্রাকৃতিক খাবার খাইয়ে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে বড় করা হয়েছে। সম্রাটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো তার শান্ত স্বভাব ও কপালের মনোমুগ্ধকর রঙ। আশা করছি, এবারের কোরবানির হাটে সম্রাট সবাইকে মুগ্ধ করবে।”
একই খামারের অপর শ্রমিক রতন জানান, “সম্রাটের যত্ন নেওয়া আমাদের প্রতিদিনের আনন্দের অংশ হয়ে গেছে। ও ভাত খেতে খুব ভালোবাসে, তাই প্রতিদিন বড় পাতিলে করে ওর জন্য আতপ চালের ভাত রান্না করতে হয়। দিনে তিনবার গোসল করানো আর ওর থাকার জায়গা পরিষ্কার রাখতেই আমাদের তিন জনের পুরো সময় কেটে যায়। এত বড় গরু শান্তভাবে সামলানো কঠিন, কিন্তু সম্রাট আমাদের সব কথা বোঝে।”
খাগড়াছড়ি জেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর কর্মকর্তা মো. আলী আজম জানান, এবছর খাগড়াছড়িতে চাহিদার ছেয়ে অনেক বেশি গরু উৎপাদন হয়েছে। জেলায় চাহিদা রয়েছে ১৩ হাজার এবং উদপাদন হয়েছে ১৮ হাজারেরও বেশি। স্বাভাবিক খাবার খেয়ে পহাড়ি গরু বড় হয়।
রাসায়নিক খাবা খাওয়ানো হয় না। এ ব্যাপারে খামারিরাও যতেষ্ট সচেতন রয়েছে। যার ফলে খামারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষন ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে উদ্ভুত ও সচেতন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। বড় আকারের পশু উৎপাদনে প্রাকৃতিক খাদ্য ও সঠিক পরিচর্যার কোনো বিকল্প নেই। ‘সম্রাট’-এর মতো পশু স্থানীয় খামারিদের অনেক বেশি উৎসাহিত করবে।”
শেঠ এগ্রো ফার্মের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে— সঠিক যত্ন, ধৈর্য আর প্রাকৃতিক খাবার দিয়ে সাধারণ গরুকেও ‘সম্রাট’ বানানো সম্ভব। মাটিরাঙ্গার এই দানবাকৃতির ষাঁড় এখন শুধু একটি পশু নয়, বরং সফল খামার ব্যবস্থাপনার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
আপনার মতামত লিখুন :