চট্টগ্রাম শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

আবাসন খাতের সংকটে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে উদ্বেগ

  • প্রতিবেদক
  • আপডেট : ০১:৫৪:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
  • ৭ বার
১২

বিশেষ প্রতিনিধি:: একটি দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি শুধু বড় শিল্পকারখানা কিংবা রপ্তানি খাতের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকে আবাসনসহ বিভিন্ন সহযোগী শিল্পের কার্যক্রম। আবাসন খাতে বিনিয়োগ, নির্মাণকাজ ও ফ্ল্যাট বিক্রির গতি কমে গেলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, রং, কাচ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ অসংখ্য শিল্পে। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা। এ কারণে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে আবাসন খাতকে সুরক্ষা দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশিষ্টজনেরা।

বাসস্থান মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে একটি স্থায়ী আবাস গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন প্রায় সবাই। মানুষের এই চাহিদা পূরণে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় বর্তমানে এ খাতের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব শুধু আবাসন ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতকে কেবল ভবন নির্মাণ কিংবা ফ্ল্যাট কেনাবেচার ব্যবসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে এ খাতের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই আবাসন খাতের সংকট মোকাবিলা এবং এর কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি আবাসন খাতের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বজায় রাখা, শিল্প উৎপাদন সচল রাখা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ক্ষেত্রে আবাসন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আবাসন শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে আড়াই শতাধিক সহযোগী ও উপশিল্প। ফলে এ খাতে নির্মাণকাজের গতি কমে গেলে একসঙ্গে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

এর মধ্যে রয়েছে রড, সিমেন্ট, ইট, পাথর, বালি এবং সিরামিক ও টাইলস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি ভবনের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও নির্মাণের শেষ পর্যায়ের কাজে ব্যবহৃত রং, কাচ ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পও আবাসন খাতের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক তার, সুইচ-সকেট, আলোকসজ্জার সরঞ্জাম, পাইপ এবং স্যানিটারি ফিটিংস উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসার সঙ্গেও এ খাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আবাসন বাজারে মন্দা দেখা দিলে কিংবা ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি কমে গেলে নির্মাণকাজের চাহিদা হ্রাস পায়। এর প্রভাব দ্রুত পড়ে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও বিক্রিতে। একপর্যায়ে কারখানায় উৎপাদন কমানো, ব্যবসা সংকুচিত করা এবং নতুন বিনিয়োগ স্থগিত রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে সামগ্রিক শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নির্মাণ ও আবাসন খাত দেশের অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থানমুখী খাত। এ খাতের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রকৌশলী, স্থপতি, প্রকল্প ব্যবস্থাপক, নির্মাণকাজের তদারককারী থেকে শুরু করে রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ শ্রমিক।

শুধু নির্মাণকাজেই নয়, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও সরবরাহের মতো সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডেও বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে আবাসন খাতের কার্যক্রম ব্যাহত হলে এর প্রভাব শ্রমবাজারেও পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেখা দিলে বিপুলসংখ্যক মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা। এর প্রভাব পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, বাজারে পণ্যের চাহিদা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পড়তে পারে। তাই কর্মসংস্থান রক্ষা ও অর্থনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আবাসন খাতের স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা।

দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যবসাবান্ধব নীতি: বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে স্থিতিশীল, সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানো গেলে উদ্যোক্তারা পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পাবেন।

সহজ শর্তে গৃহঋণ: ক্রেতা ও আবাসন নির্মাতা—উভয় পক্ষের জন্য সহজ শর্তে এবং তুলনামূলক কম সুদে ঋণ ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করা জরুরি। এতে ফ্ল্যাট কেনার সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি নির্মাণ প্রকল্পের অর্থায়নেও সহায়তা মিলতে পারে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার: আবাসন খাতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে পরিকল্পিত আবাসন উন্নয়ন এবং বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

নির্মাণসামগ্রীর বাজার স্থিতিশীল রাখা: রড, সিমেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বাজার তদারকি প্রয়োজন। এসব উপকরণের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে নির্মাণ ব্যয় বাড়ে, যা আবাসনের মূল্য ও ক্রেতাদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট খাতের বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন, আবাসন শিল্পের সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার, নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় বাস্তবসম্মত নীতিসহায়তা, সহজ অর্থায়ন এবং নির্মাণসামগ্রীর মূল্য স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ এ খাতের কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে সহায়ক হতে পারে।

তাঁদের প্রত্যাশা, আবাসন খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা এর উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। কারণ, একটি গতিশীল আবাসন খাত শুধু মানুষের বাসস্থানের চাহিদা পূরণ করে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য শিল্পের উৎপাদন, বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক অগ্রগতি। তাই আবাসন খাতকে সুরক্ষিত রাখা মানে এর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য শিল্পের বিকাশের পথও সুগম করা।

Download Photocard

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Al- Mamun