আপডেট :
০৫:২৯:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৮
বার
দুদকের দরজায় উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সামনে এখন বড় তদন্ত
বিশেষ প্রতিনিধি:: একটি সরকারের পতন বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তার রেখে যাওয়া সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের হিসাব-নিকাশ শুরু হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার কর্মকাণ্ড নিয়ে যখন একের পর এক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ-বাণিজ্য ও অর্থপাচারের অভিযোগ সামনে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এসবের কতটা সত্য? সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বিষয়টি জানান। এই অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে শুধু একজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তই শুরু হলো না; একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের দাবিও নতুন করে সামনে এসেছে। দুদকের কাছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের একটি অংশ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩৮ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন কর্মস্থলে পদায়নের বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। একই অভিযোগে ১৫০ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য দেড় কোটি টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য আরও ২ কোটি টাকা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই অর্থ যদি সত্যিই লেনদেন হয়ে থাকে, তাহলে অর্থের উৎস ও গন্তব্য কোথায়? কার মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়েছে? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি ও পদোন্নতির নথিতে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল কি না? দুদকের অনুসন্ধানেই এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে। দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন, ঢাকা ওয়াসার এমডি নিয়োগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেন, সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং বিদেশে সম্পদ রাখার মতো বিষয়। তবে অভিযোগ জমা পড়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ফলে প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন নথিপত্র, ব্যাংক হিসাব, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ উপদেষ্টাকে দিতে হতো—এমন অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কথিত প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলম এই কমিশন-সংক্রান্ত কার্যক্রম তদারক করতেন। অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। তাই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর অনুমোদন, বরাদ্দ, ঠিকাদার নির্বাচন, বিল পরিশোধ এবং অর্থ ছাড়ের নথি পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামের নিয়োগ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই নিয়োগের জন্য মোট ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ের আল-আনসারি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাঠানো এবং ২ কোটি টাকা নগদ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এমন কোনো অর্থ লেনদেনের আর্থিক প্রমাণ আছে কি না। ব্যাংক হিসাব, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক বিবরণী এবং যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগটির সত্যতা বা অসত্যতা নির্ণয় করা সম্ভব। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ এজাজকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই নিয়োগের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০ কোটি টাকা নগদ এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিয়মিত ১০ শতাংশ কমিশনের শর্তে নিয়োগটি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এজাজের বিরুদ্ধে পশুর হাট ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প, সম্পত্তি ও দোকান বরাদ্দসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তদন্তের ক্ষেত্রে তাই শুধু নিয়োগের সময়কার সিদ্ধান্ত নয়, পরবর্তী সময়ে প্রশাসক হিসেবে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়েছে এবং কথিত প্রেস সেক্রেটারি বিভিন্ন টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার করেছেন। এখানে তদন্তের জন্য একটি বড় প্রশ্ন—কোন কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যাদেশ পেয়েছে? প্রতিটি টেন্ডারের দরপত্র, মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত, কার্যাদেশ, বিল পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বিশ্লেষণ করলে কোনো সিন্ডিকেট বা যোগসাজশের অস্তিত্ব থাকলে তা শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়েও আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সারাদেশে জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি ৪৮টি ডিও লেটার দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩৬ জনকে পরবর্তীতে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, জেলা অনুযায়ী ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে—কোন কর্মকর্তার পক্ষে কখন ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে, সেই কর্মকর্তা কীভাবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর্থিক অবস্থানে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটেছে কি না—তা পর্যালোচনা করা। আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব প্রকাশের পর তার সম্পদ নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়। পরবর্তীতে ক্রিপ্টোকারেন্সি, দুবাইয়ে বিনিয়োগ এবং সুইজারল্যান্ডে ব্যাংক হিসাব থাকার দাবিও সামনে আসে। এসব দাবির সত্যতা এখনো আলাদা করে প্রমাণিত নয়। তবে যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালে তার সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তাহলে দেশীয় ও বিদেশি সম্পদের উৎস যাচাই করা দুর্নীতি অনুসন্ধানের স্বাভাবিক অংশ। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ বৃদ্ধির পরিসংখ্যানও এ প্রসঙ্গে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশিদের মোট জমা অর্থকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অর্থ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। প্রয়োজন হবে ব্যক্তি-নির্দিষ্ট আর্থিক তথ্য। দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত যদি সত্যিই বিস্তৃত হয়, তাহলে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কর্মকাণ্ডও এর বাইরে থাকার কথা নয়—এমন দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিদেশি বিনিয়োগ, সরকারি অনুমোদন এবং বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগের একটি অংশে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে ফ্রান্সের গ্রামীণ ক্রেডিট এগ্রিকল ফাউন্ডেশনে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ হয়েছে। একই সময়ে গ্রামীণ আমেরিকায় প্রায় ১২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ বাড়ার কথাও বলা হয়েছে। এখন তদন্তের প্রশ্ন—এই অর্থ কোথা থেকে এসেছে? বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কি? সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্রে অর্থের উৎস কী দেখানো হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর নথিপত্রের মাধ্যমেই বের করা সম্ভব। ইউনূস সরকারের সময়ে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সরকারি অনুমোদন ও সুবিধা পেয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানি লাইসেন্স এবং গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমোদন—এসব বিষয় আলোচনায় এসেছে। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের কর সুবিধা এবং ব্যাংকে সরকারের শেয়ারের হার ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের প্রধান ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ স্বার্থসংশ্লিষ্টতা থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত। আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি ছিল সাব-রেজিস্ট্রার বদলি। অভিযোগকারীদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি হয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ভালো কর্মস্থলে বদলির জন্য ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত এবং সাধারণ বদলির ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের দাবিও রয়েছে। এখানে প্রশ্ন হলো—এত বিপুল সংখ্যক বদলির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং বদলির আগে-পরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো মধ্যস্থতাকারীর যোগাযোগ ছিল কি না। ২০২৫ সালের ২ জুন দেশের বিভিন্ন আদালতের ২৫২ বিচারককে একযোগে বদলি করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ করা হয়, বদলির পেছনে আর্থিক লেনদেনের একটি চক্র কাজ করেছে এবং এর সঙ্গে আসিফ নজরুলের সম্পৃক্ততা ছিল। অভিযোগে কয়েক শ কোটি টাকা লেনদেনের দাবিও করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ফলে বিচারকদের বদলির সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন আসামির জামিন নিশ্চিত করার অভিযোগও রয়েছে। তবে এই অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে নির্দিষ্ট মামলার তথ্য সামনে আনতে হবে। কোন মামলায় কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, কে আইনজীবী ছিলেন, কার মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে এবং কোনো অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন ঘটেছে কি না—এসবই তদন্তের বিষয় হতে পারে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স অনুমোদন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময়ে ২৫২টি নতুন প্রতিষ্ঠানকে রিক্রুটিং লাইসেন্স দেওয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে—প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কি নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছিল? লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব কাজ করেছে কি না? কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না? লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীকেও ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের একটি অংশে দাবি করা হয়, আবু বকর সিদ্দিকীর সঙ্গে সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের দীর্ঘদিনের পরিচয় ও পেশাগত সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক লেনদেনে মধ্যস্থতার অভিযোগও করা হয়েছে। এ ছাড়া উপদেষ্টা হওয়ার পর রিজওয়ানা হাসান ও তার পরিবারের সম্পদ বেড়েছে—এমন দাবিও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি হবে সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব এবং সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল। শুধু আসিফ মাহমুদ, আসিফ নজরুল কিংবা রিজওয়ানা হাসান নন—ইউনূস সরকারের আরও কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ থাকার দাবি করা হয়েছে। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরজাহান বেগম ও আদিলুর রহমান খানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দুদকে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি রয়েছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রযোজ্য—অভিযোগ থাকলেই অপরাধ প্রমাণিত হয় না। আবার অভিযোগ থাকার কারণে তদন্ত না করাও জবাবদিহির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়া তাই একটি বড় প্রশ্নের দরজা খুলে দিয়েছে—অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়ের দুর্নীতির অভিযোগগুলো কি একইভাবে যাচাই করা হবে? সরকারের প্রধান থেকে শুরু করে উপদেষ্টা, আমলা কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি—কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্তের ভিত্তি হতে হবে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তথ্য ও প্রমাণ। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগের পেছনে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে তাকেও দায়মুক্তি দিতে হবে। জনগণের স্বার্থে তাই প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও স্বাধীন তদন্ত—যেখানে নিয়োগ-বদলি, পদায়ন, টেন্ডার, উন্নয়ন প্রকল্প, বিদেশি সম্পদ, অর্থপাচার এবং সরকারি সুবিধা প্রদানের প্রতিটি অভিযোগ আলাদাভাবে যাচাই করা হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়েছিল কি না। আর সেই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বেরিয়ে আসতে হবে তদন্তের নথি ও প্রমাণ থেকে।
৯
বিশেষ প্রতিনিধি:: একটি সরকারের পতন বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তার রেখে যাওয়া সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের হিসাব-নিকাশ শুরু হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার কর্মকাণ্ড নিয়ে যখন একের পর এক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ-বাণিজ্য ও অর্থপাচারের অভিযোগ সামনে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এসবের কতটা সত্য?
সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বিষয়টি জানান।
এই অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে শুধু একজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তই শুরু হলো না; একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের দাবিও নতুন করে সামনে এসেছে। দুদকের কাছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের একটি অংশ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি ঘিরে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩৮ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন কর্মস্থলে পদায়নের বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। একই অভিযোগে ১৫০ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য দেড় কোটি টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য আরও ২ কোটি টাকা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—এই অর্থ যদি সত্যিই লেনদেন হয়ে থাকে, তাহলে অর্থের উৎস ও গন্তব্য কোথায়? কার মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়েছে? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি ও পদোন্নতির নথিতে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল কি না?
দুদকের অনুসন্ধানেই এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে। দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ জমা পড়েছে।
এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন, ঢাকা ওয়াসার এমডি নিয়োগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেন, সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং বিদেশে সম্পদ রাখার মতো বিষয়।
তবে অভিযোগ জমা পড়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ফলে প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন নথিপত্র, ব্যাংক হিসাব, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ উপদেষ্টাকে দিতে হতো—এমন অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কথিত প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলম এই কমিশন-সংক্রান্ত কার্যক্রম তদারক করতেন। অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।
তাই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর অনুমোদন, বরাদ্দ, ঠিকাদার নির্বাচন, বিল পরিশোধ এবং অর্থ ছাড়ের নথি পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামের নিয়োগ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই নিয়োগের জন্য মোট ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ের আল-আনসারি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাঠানো এবং ২ কোটি টাকা নগদ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এমন কোনো অর্থ লেনদেনের আর্থিক প্রমাণ আছে কি না।
ব্যাংক হিসাব, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক বিবরণী এবং যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগটির সত্যতা বা অসত্যতা নির্ণয় করা সম্ভব। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ এজাজকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
এই নিয়োগের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০ কোটি টাকা নগদ এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিয়মিত ১০ শতাংশ কমিশনের শর্তে নিয়োগটি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এজাজের বিরুদ্ধে পশুর হাট ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প, সম্পত্তি ও দোকান বরাদ্দসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
তদন্তের ক্ষেত্রে তাই শুধু নিয়োগের সময়কার সিদ্ধান্ত নয়, পরবর্তী সময়ে প্রশাসক হিসেবে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়েছে এবং কথিত প্রেস সেক্রেটারি বিভিন্ন টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার করেছেন। এখানে তদন্তের জন্য একটি বড় প্রশ্ন—কোন কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যাদেশ পেয়েছে?
প্রতিটি টেন্ডারের দরপত্র, মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত, কার্যাদেশ, বিল পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বিশ্লেষণ করলে কোনো সিন্ডিকেট বা যোগসাজশের অস্তিত্ব থাকলে তা শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়েও আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সারাদেশে জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি ৪৮টি ডিও লেটার দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩৬ জনকে পরবর্তীতে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, জেলা অনুযায়ী ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে—কোন কর্মকর্তার পক্ষে কখন ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে, সেই কর্মকর্তা কীভাবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর্থিক অবস্থানে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটেছে কি না—তা পর্যালোচনা করা।
আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব প্রকাশের পর তার সম্পদ নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়। পরবর্তীতে ক্রিপ্টোকারেন্সি, দুবাইয়ে বিনিয়োগ এবং সুইজারল্যান্ডে ব্যাংক হিসাব থাকার দাবিও সামনে আসে।
এসব দাবির সত্যতা এখনো আলাদা করে প্রমাণিত নয়। তবে যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালে তার সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তাহলে দেশীয় ও বিদেশি সম্পদের উৎস যাচাই করা দুর্নীতি অনুসন্ধানের স্বাভাবিক অংশ।
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ বৃদ্ধির পরিসংখ্যানও এ প্রসঙ্গে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশিদের মোট জমা অর্থকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অর্থ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। প্রয়োজন হবে ব্যক্তি-নির্দিষ্ট আর্থিক তথ্য।
দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত যদি সত্যিই বিস্তৃত হয়, তাহলে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কর্মকাণ্ডও এর বাইরে থাকার কথা নয়—এমন দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিদেশি বিনিয়োগ, সরকারি অনুমোদন এবং বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগের একটি অংশে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে ফ্রান্সের গ্রামীণ ক্রেডিট এগ্রিকল ফাউন্ডেশনে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ হয়েছে। একই সময়ে গ্রামীণ আমেরিকায় প্রায় ১২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ বাড়ার কথাও বলা হয়েছে।
এখন তদন্তের প্রশ্ন—এই অর্থ কোথা থেকে এসেছে? বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কি? সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্রে অর্থের উৎস কী দেখানো হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর নথিপত্রের মাধ্যমেই বের করা সম্ভব। ইউনূস সরকারের সময়ে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সরকারি অনুমোদন ও সুবিধা পেয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানি লাইসেন্স এবং গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমোদন—এসব বিষয় আলোচনায় এসেছে। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের কর সুবিধা এবং ব্যাংকে সরকারের শেয়ারের হার ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের প্রধান ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ স্বার্থসংশ্লিষ্টতা থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত। আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি ছিল সাব-রেজিস্ট্রার বদলি।
অভিযোগকারীদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি হয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ভালো কর্মস্থলে বদলির জন্য ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত এবং সাধারণ বদলির ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের দাবিও রয়েছে। এখানে প্রশ্ন হলো—এত বিপুল সংখ্যক বদলির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং বদলির আগে-পরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো মধ্যস্থতাকারীর যোগাযোগ ছিল কি না। ২০২৫ সালের ২ জুন দেশের বিভিন্ন আদালতের ২৫২ বিচারককে একযোগে বদলি করা হয়।
এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ করা হয়, বদলির পেছনে আর্থিক লেনদেনের একটি চক্র কাজ করেছে এবং এর সঙ্গে আসিফ নজরুলের সম্পৃক্ততা ছিল। অভিযোগে কয়েক শ কোটি টাকা লেনদেনের দাবিও করা হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ফলে বিচারকদের বদলির সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন আসামির জামিন নিশ্চিত করার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এই অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে নির্দিষ্ট মামলার তথ্য সামনে আনতে হবে। কোন মামলায় কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, কে আইনজীবী ছিলেন, কার মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে এবং কোনো অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন ঘটেছে কি না—এসবই তদন্তের বিষয় হতে পারে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স অনুমোদন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময়ে ২৫২টি নতুন প্রতিষ্ঠানকে রিক্রুটিং লাইসেন্স দেওয়া হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে—প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কি নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছিল? লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব কাজ করেছে কি না? কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না? লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীকেও ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের একটি অংশে দাবি করা হয়, আবু বকর সিদ্দিকীর সঙ্গে সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের দীর্ঘদিনের পরিচয় ও পেশাগত সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক লেনদেনে মধ্যস্থতার অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া উপদেষ্টা হওয়ার পর রিজওয়ানা হাসান ও তার পরিবারের সম্পদ বেড়েছে—এমন দাবিও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি হবে সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব এবং সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল।
শুধু আসিফ মাহমুদ, আসিফ নজরুল কিংবা রিজওয়ানা হাসান নন—ইউনূস সরকারের আরও কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ থাকার দাবি করা হয়েছে। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরজাহান বেগম ও আদিলুর রহমান খানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দুদকে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি রয়েছে।
এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রযোজ্য—অভিযোগ থাকলেই অপরাধ প্রমাণিত হয় না। আবার অভিযোগ থাকার কারণে তদন্ত না করাও জবাবদিহির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়া তাই একটি বড় প্রশ্নের দরজা খুলে দিয়েছে—অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়ের দুর্নীতির অভিযোগগুলো কি একইভাবে যাচাই করা হবে?
সরকারের প্রধান থেকে শুরু করে উপদেষ্টা, আমলা কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি—কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্তের ভিত্তি হতে হবে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তথ্য ও প্রমাণ। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগের পেছনে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে তাকেও দায়মুক্তি দিতে হবে।
জনগণের স্বার্থে তাই প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও স্বাধীন তদন্ত—যেখানে নিয়োগ-বদলি, পদায়ন, টেন্ডার, উন্নয়ন প্রকল্প, বিদেশি সম্পদ, অর্থপাচার এবং সরকারি সুবিধা প্রদানের প্রতিটি অভিযোগ আলাদাভাবে যাচাই করা হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়েছিল কি না। আর সেই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বেরিয়ে আসতে হবে তদন্তের নথি ও প্রমাণ থেকে।