সব
facebook raytahost.com
কারাগার যেন আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ | Protidiner Khagrachari

কারাগার যেন আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ

কারাগার যেন আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ

* টাকা ছাড়া মেলে না থাকার জায়গা * ক্যান্টিনে ৩ গুণ দামে রান্না খাবার * বলা যায় মোবাইল কথা,ফোন কলের মিনিট ২০ টাকা*

ডেস্ক রিপাের্ট:: নিয়মের কোন বালাই নেই খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারে। সকল অনিয়মকেই নিয়ম করে নেওয়া হয়েছে এখানে। দেদারসে নগদ টাকার লেনদেন চলছে কারা অভ্যন্তরে। এই কারাগারে বন্দিদের থাকার প্রতিটি ওয়ার্ডকে বানানো হয়েছে একেকটি আবাসিক হোটেল। কারা ক্যান্টিন পরিণত হয়েছে চড়া দামের রেস্তোরাঁয়। বিপরীতে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত খাবারের অর্ধেকও দেওয়া হয় না বন্দিদের। এ ছাড়া বন্দিদের সাথে কারাগারে সাক্ষাৎ করতে আসা স্বজনদের কাছ থেকেও নেওয়া হয় মোটা অংকের টাকা। নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রতি মিনিট ফোন কলের চার্জ হিসেবে নেওয়া হয় বিশ টাকা করে।

খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারে একজন জেল সুপার রয়েছেন। তবে জেল সুপার মো. এনামুল কবিরের কোন কর্তৃত্ব চলে না এখানে। কারাগারের এই অঘোষিত আবাসিক হোটেল এবং রেস্তোরাঁর মালিক বনে গেছেন জেলার আক্তার হোসেন শেখ। অভিযোগের পাহাড় জমেছে জেলারের বিরুদ্ধে।

১০ শতাংশ কমিশনে নগদ টাকার লেনদেন :

কোন কারাগারেই নগদ টাকার লেনদেন করার নিয়ম নেই। বন্দিদের প্রত্যেকেরই একটি করে প্রিজনার ক্যাশ (পিসি) বা ব্যক্তিগত তহবিল কার্ড রয়েছে। তবে খাগড়াছড়ি কারাগারে পিসি কার্ডের চেয়ে দশ গুণ বেশি লেনদেন হয় নগদ টাকার। আর এসব নগদ টাকা প্রবেশ করানো হয় সাক্ষাৎ কক্ষের গ্রিলের ফাঁক দিয়ে পাইপের মাধ্যমে। ডিওটিরত কারারক্ষীরা এর জন্য জেলারের কমিশন বাবদ শতকরা ১০ টাকা অর্থাৎ প্রতি হাজারে ১০০ টাকা করে কেটে রাখেন বন্দিদের কাছ থেকে। এ ছাড়া বন্দিদের সাথে সাক্ষাতের সময়ও আসামি বা তার স্বজনের কাছ থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়।

খাগড়াছড়ি জেলা সদরের বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন, ‘আমার এক নিকটাত্মীয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম।সাক্ষাতের আগে বাইরের ক্যান্টিনে মোবাইল জমা রাখতে ৫০ টাকা দিতে হয়েছে। পরে সাক্ষাৎ করতে দিতে হয়েছে আরও ৫০০ টাকা।’

বন্দিদের থাকতে হয় মাসিক ভাড়ায় :

খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারে দৈনিক গড়ে ১৭০ থেকে ২০০ জন আসামি থাকে। তবে হোক সে কয়েদি কিংবা হাজতি, এই কারাগারের সকল বন্দিকেই দিতে হয় মাসিক ভাড়া। ২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতিজন বন্দির কাছ থেকে মাসিক ভাড়া হিসেবে তিন হাজার থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার টাকা এবং ৩ নম্বর ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডে দেড় হাজার থেকে শুরু করে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। মহিলা ওয়ার্ডেরও একই অবস্থা।

পুরুষ বা মহিলা, যে কোন আসামিকে কারাগারে প্রেরণ করা হলে ওইদিনই পুরো মাসের অগ্রিম ভাড়া নিয়ে তারপর থাকার জায়গা করে দেওয়া হয় তার। কেউ টাকা দিতে না পারলে তার জায়গা হয় ওয়ার্ডের টয়লেটের পাশে খালি মেঝেতে। কোনো আসামি যদি একদিন বা এক সপ্তাহ পর জামিন লাভ করে তবুও তাকে দিয়ে আসতে হয় পুরো মাসের ভাড়া।

সাম্প্রতিক সময়ে কারাগার থেকে জামিনে আসা মাটিরাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা মো. হোসেন বলেন, ‘জেলাখানায় টাকা ছাড়া কোন মূল্য নেই আসামিদের। প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে কয়েদিকে ম্যানেজার (ওয়ার্ডের ম্যাড) বানিয়ে বন্দিদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করা হয়৷ আমি ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ছিলাম। থাকার জায়গার ভাড়া হিসেবে ওয়ার্ডের ম্যাডকে দেড় হাজার টাকা দিতে হয়েছে।’

কারা ক্যান্টিনে রমরমা বাণিজ্য :

বিড়ি-সিগারেট থেকে শুরু করে রান্না করা তরকারিও বিক্রি করা হয় খাগড়াছড়ি কারাগারের অভ্যন্তরীণ ক্যান্টিনে। তবে প্রতিটি পণ্যে বাজারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও ৪০-৫০ শতাংশ বেশি দাম নেওয়া হয় বন্দিদের কাছ থেকে৷ এ ছাড়া রান্না করা তরকারির দাম নেওয়া হয় তিন গুণ বেশি। এক কেজি ব্রয়লার মুরগি বাজারে ১৮০ টাকায় কিনে নিয়ে সেটি কারাগারের বন্দিদের কাছে কাঁচা বিক্রি করা হয় ৫০০ টাকায়। এরপর যুক্ত করা হয় রান্নার খরচ। এভাবে ৭৫০ টাকার গরুর মাংস কেজি বিক্রি হয় ২৫০০ টাকায়।

তবে বাড়তি টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও নিয়মবহির্ভূতভাবে ক্যান্টিনে রান্না করা তরকারি বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করেছেন কারা অভ্যন্তরের ক্যান্টিন ম্যানেজার কারারক্ষী রিয়াদ। তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যে তরকারি রান্না করে বিক্রি করা হয়। জেলার স্যার সব জানেন।’

ফোন কলের মিনিট চার্জ ২০ টাকা :

নিয়ম হল কারা অভ্যন্তরের টেলিফোন থেকে প্রতিজন বন্দি মিনিট ১ টাকা হারে সপ্তাহে একদিন কেবল সর্বোচ্চ ৫ মিনিট কথা বলতে পারবেন। আর কথা বলার চার্জ কর্তন করা হবে পিসি কার্ড থেকে। বর্তমানে খাগড়াছড়ি কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দিদের টেলিফোনে কথা বলাবার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন কারারক্ষী তুষার। নিয়মবহির্ভূতভাবে তিনি বন্দিদের কাছ থেকে প্রতি মিনিট নগদ ২০ টাকা করে চার্জ আদায় করেন। মিনিট ২০ টাকা করে দিলে বন্দিরা যখন যতো মিনিট ইচ্ছে কথা বলতে পারেন তার কাছ থেকে।

প্রতি মিনিট ২০ টাকা হারে কার নির্দেশে আদায় করছেন তা জানতে চাইলে দায়িত্বরত কারারক্ষী তুষার বলেন, ‘আমি ছোট চাকরি করি। বেশি কিছু বলতে পারবো না। বেশি কিছু বললে শেষে আমাকেই বিপদে পড়তে হবে।’

বরাদ্দকৃত খাবার পান না বন্দিরা :

সদ্য জামিনপ্রাপ্ত আসামি পানছড়ি উপজেলার বাসিন্দা ইমন বলেন, ‘বন্দিদের যেসব খাবার দেওয়া হয় তার মান খুবই খারাপ। রান্না তরকারি এবং ডাল সবই খাবার অনুপযোগী। বাধ্য হয়ে তাই বেশিরভাগ আসামিকে ক্যান্টিন থেকে চড়া দামে তরকারি কিনে খেতে হয়।’

জেল কোড অনুযায়ী বন্দিদের জন্য সরকারিভাবে যে পরিমাণ খাবার বরাদ্দ থাকে তার অর্ধেকও পায় না খাগড়াছড়ি কারাগারের বন্দিরা। প্রতিদিনের বরাদ্দকৃত ডাল, তেল, মসলা ও পেঁয়াজ অর্ধেকের বেশি লোপাট করা হয়। মাছ এবং মাংসও দেওয়া হয় বরাদ্দের চেয়ে অনেক কম। আর এই লোপাটের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সহকারী প্রধান কারারক্ষী ছবিরঞ্জন ত্রিপুরাকে। প্রতিদিন সকালে তিনি নিত্য প্রয়োজনীয় এসব খাদ্যদ্রব্য নিয়ে কারা অভ্যন্তরের রান্না ঘরে যান। তবে ছবি তুলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানোর পর তা থেকে অর্ধেকের বেশি খাদ্যদ্রব্য সরিয়ে রাখেন তিনি। পরে বেলা ১২ টার দিকে তিনি পুনরায় কারা অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন এবং সরিয়ে রাখা খাদ্যদ্রব্যগুলো বাইরে নিয়ে আসেন। এরপর সেসব খাদ্যদ্রব্য কাশেম নামের একজন অটোরিকশা চালককে দিয়ে খাগড়াছড়ি বাজারের একটি মুদি দোকানে বিক্রি করান ছবিরঞ্জন ত্রিপুরা।

এ ছাড়া জামিনপ্রাপ্ত প্রতিটি আসামির কাছ থেকেও মুক্তি দিতে টাকা আদায় করেন ছবিরঞ্জন ত্রিপুরা। কেউ টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে নানা ভুলের অজুহাতে ওই দিন মুক্তি দেওয়া হয় না জামিনপ্রাপ্ত বন্দিদের।

সহকারী প্রধান কারারক্ষী ছবিরঞ্জন ত্রিপুরা এক যুগ ধরে এই কারাগারেই রাজত্ব করছেন। মাঝখানে কিছু সময়ের জন্য বদলি হয়ে অন্য জেলখানায় যোগদান করলেও খুব বেশিদিন লাগেনি পুনরায় খাগড়াছড়ি কারাগারে বদলি নিয়ে আসতে।যুগ ধরে একই কারাগারের থাকার সুবাদে খাগড়াছড়ি শহরেই বাড়ি গড়ে নিয়েছেন তিনি। খাগড়াছড়ির নিজের বাড়িতেই পরিবার নিয়ে বসবাস এবং এই জেলাখানায় চাকরি তার।

এ সকল বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী প্রধান কারারক্ষী ছবিরঞ্জন ত্রিপুরা কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি। তবে সংবাদ প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানান এবং উৎকোচ দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘জেলার স্যার চা খেতে দিয়েছেন।’ উৎকোচ দেওয়া প্রসঙ্গে জেলারের কাছে জানতে চাইলে জেলার আক্তার হোসেন শেখ বলেন, ‘আরে রাখেন এটা। মোটরসাইকেলে তেল ভরবেন।’

জেলারের নামে আরও যতো অভিযোগ :

খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারের জেলার আক্তার হোসেন শেখের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কারারক্ষী। তাদের অভিযোগ, জেলার টাকার বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে কারারক্ষীদের মাসের পর মাস ছুটি দিয়ে রাখেন। কোন কোন কারারক্ষী টানা এক মাসও ছুটি কাটান। তবে এর বিনিময়ে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে নেন জেলার আক্তার হোসেন শেখ। আর সব জেনেও চুপ থাকেন জেল সুপার মো. এনামুল কবির।

জেলার আক্তার হোসেন শেখ শাস্তিমূলক বদলি নিয়ে খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারে যোগদান করেছেন গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর। এর আগে তিনি ঝালকাঠি কারাগারের জেলার থাকাকালীন এক কারাবন্দির স্ত্রীকে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেন ও অশালীন আচরণ করেন—এমন লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে সত্যতা পাওয়ায় ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেস্বর তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্তির পর বদলি করা হয় খাগড়াছড়িতে। এ ছাড়া ঝালকাঠির দায়িত্বকালীন সময়ে ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি প্রথমসারির একটি জাতীয় দৈনিকে ‘জেলে বন্দিদের জিম্মি করে বাণিজ্যের অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ওই একই কায়দায় খাগড়াছড়ি কারাগারকেও তিনি আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ব্যবসা ক্ষেত্রে পরিণত করেছেন।

এসব অনিয়ম প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ির জেলার আক্তার হোসেন শেখ কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন। উল্টো দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছেন বন্দিদের ম্যাড ও কারারক্ষীদের ঘাড়ে। তিনি বলেন, ‘যদি কারা অভ্যন্তরে এমন কোন অনিয়ম হয়ে থাকে তবে তার সাথে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ম্যাড এবং দায়িত্বরত কারারক্ষীরা জড়িত থাকতে পারে। আমি বিষয়গুলো সিরিয়াসলি দেখবো। আগামীকাল থেকে আর এমন কোন অনিয়ম হবে না এখানে।’

এদিকে জেল সুপার মো. এনামুল কবিরও দিলেন দায়সাড়া জবাব। তিনি জানালেন কোন অনিয়মই হয় না এই কারাগারে। পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে বললেন- ‘খুব ছোট একটা জেল এটা। সাপ খাওয়া পাহাড়িরা কয় টাকা দিয়ে সিট কিনবে বলেন? এরা টাকা কোথায় পাবে বলেন?’

কারা অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-মহাপরিদর্শক টিপু সুলতান বলেন, ‘অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখবো। সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সূত্র: খবরের কাগজ।

আপনার মতামত লিখুন :

পাহাড়ের বাহারি ফলে ঢাকায় জমেছে মেলা

পাহাড়ের বাহারি ফলে ঢাকায় জমেছে মেলা

কারাগার যেন আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ

কারাগার যেন আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ

পাহাড়ে ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে সুস্বাদু পাকা আনারস

পাহাড়ে ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে সুস্বাদু পাকা আনারস

ভ্রমণ পিপাসুদের পদচারণায় মুখোরিত পর্যটন স্পর্ট

ভ্রমণ পিপাসুদের পদচারণায় মুখোরিত পর্যটন স্পর্ট

ক্রেতা-বিক্রেতা শুন্য দীঘিনালা কোরবানীর হাট

ক্রেতা-বিক্রেতা শুন্য দীঘিনালা কোরবানীর হাট

পাহাড়ে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট

পাহাড়ে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
সম্পাদক ও প্রকাশক : সৈকত হাসান
বার্তা সম্পাদক : মো: আল মামুন সিদ্দিক
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা।
ফোনঃ ০১৮৩৮৪৯৯৯৯৯
ই-মেইল : protidinerkhagrachari@gmail.com
© ২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। Design & Developed By: Raytahost .com