স্টাফ রিপোর্টার:: পেশায় তিনি স্বর্ণকার, কারবার তার বন্ধক,সুদ আর মোটা অঙ্কের লোভ আর প্রতারণার ভয়াবহ ফাঁদ। এতেই সর্বশান্ত খাগড়াছড়িতে ঋণের ফাঁদে নিঃস্ব হয়েছে শত শত মানুষ। আর্থিক সংকটে স্বর্ণ,বাড়ি দলিল দিয়ে ঋণ নেওয়ার পর উচ্চ সুদ আরোপ,মামলাসহ নানাভাবে ঋণগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে খাগড়াছড়ির প্রিয়া জুয়ালার্সের মালিক স্বর্ণকার সনজীব বণিক এর বিরুদ্ধে। তার বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলা শহরের আনন্দ নগরে।

খাগড়াছড়ি জেলা সদরের গুগড়াছড়ি এলাকার বাসিন্দা টিপু ত্রিপুরা বলেন ,” প্রিয়া জুয়ালার্সের মালিক সনজীব থেকে আমি ধাপে ধাপে দুইবার ২ লক্ষ ১০ হাজার টাকা নিই। স্বর্ণ কম বিধায় স্বর্ণও জমা দিই, ব্ল্যাঙ্ক চেক দুইটা আমার থেকে নেয় সে। আমার স্বামীর স্বাক্ষরিত চেক, আমি বাসা থেকে দুইটা দুইবারে চেক নিয়ে গেছি। আমি ওনাকে আসল দেড় লক্ষ টাকা দিছি। সুদে আসলে প্রায় আমি সাড়ে তিন লক্ষ টাকার মত ওনাকে ধাপে ধাপে দিছি। দেওয়ার পরে আমার থেকে ৬০ হাজার টাকা পায়, আমি ওনার থেকে স্বর্ণ পাই।

এক বছর হয়ে গেছে উনি আমার স্বর্ণ দিচ্ছে না।আমার মতো ১০০-১৫০ জনের বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা করেছে। এখন ওর জন্য হয়রানির শিকার। দিনে ভাত দিনে খেতে পারি না, একজন আমরা কৃষক। আর এত এতগুলো টাকা আমরা কোত্থেকে দিই? একটা মামলা আমাদেরকে নোটিশ দিছে ৪৭ লক্ষ ৫০ হাজার। এখন আমার আত্মহত্যা করা উপায় নেই। ”

পৌর শহরের ইসলামপুরের বাসিন্দা আসমা বেগম বলেন,” ২০২২ সালে আমার কিছু আর্থিক টাকার প্রয়োজন পড়াতে আমার নিজের ছয় ভরি স্বর্ণ আমি বন্ধক দিয়ে, চার স্টেপে বন্ধক দিছি, একেবারে না, বিভিন্নভাবে বন্ধক দিয়ে আমি ওনার থেকে ২ লক্ষ ৫ হাজার টাকা নিই। ২ লক্ষ ৫ হাজার টাকা নেওয়ার পরে একটা সময় যখন ওনাকে আমি টাকাটা রিটার্ন করি ৩% কিংবা ৪% হারে, তখন উনি ওটা নিতে ডিনাই করে আমাকে। উনি আমার কাছে একটা বিগ অ্যামাউন্ট চায়, ১২ লক্ষ টাকা দাবি করে।

তো আমি ওনাকে বললাম, ২ লক্ষ ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে এক বছরে তো ১২ লক্ষ টাকা হতে পারে না, আপনি একটু কমান। তখন উনি কি করে, আমি ৪ লাখ টাকা নিয়ে গেছিলাম, উনি ৪ লাখ টাকা আমার… এক কথায় কি, আমি একজন মহিলা মানুষ, উনি আমার নাকে-মুখে টাকাটা ছুঁড়ে মারে। আমার বোনসহ ছিল আমার সাথে, যেহেতু আমার বোনের নামেও দুইটা কার্ড, আমার বোনকে দিয়ে নেওয়া হইছিল। উনি টাকাটা ছুঁড়ে মারে, তখন আমি চলে আসি। চলে আসার পরে উনি বিভিন্নভাবে আমাকে হুমকি-ধমকি দেয়, আমাকে এই করবে, সেই করবে। তো আমি বললাম যে, আমি যে টাকাটা দিছি, আমার এবিলিটি আছে আমি এতটুকুই দিছি।

আমি তো আপনার কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নিছি, আমি ৪ লাখ দিচ্ছি। উনি বলতেছে না, ওনাকে ১০ থেকে ১৫% হারে লাভ দিতে হবে। এত টাকা লাভ ভাই আমরা মিডল ক্লাস ফ্যামিলি, আমার ছয় ভরি স্বর্ণ ওনার কাছে। তো স্বর্ণটা ওনার কাছেই পড়ে থাকে, দেন পরে উনি কোনো এক চক্র একসাথে হয়ে ওনার নামে… উনি আমার নামে ২০ লক্ষ টাকার একটা মামলা করে। এর মধ্যে আমার ছয় ভরি স্বর্ণের এখন বর্তমান বাজারমূল্য ১২ লক্ষ টাকা। উনি আমার স্বর্ণও দিচ্ছে না, স্বর্ণটাও জিম্মি করে রাখছে, দেন আপনার ২০ লক্ষ টাকার মামলাও করে রাখছে। আমি একজন সাধারণ গৃহিণী মানুষ, ২০ লক্ষ টাকা দেওয়ার এবিলিটি তো আমার নাই। এখন আমি দেখতেছি এমন ভুক্তভোগী প্রায় ১০০-১৫০ জন মানুষ রাঙ্গুনিয়াতে। ১ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ১০ লক্ষ টাকার মামলা, ২ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ২০ লাখ টাকার মামলা, এটার একটা সঠিক জাস্টিস প্রশাসনের কাছে চাই। ”

আরেকভুক্তভোগী ঠাকুরছড়া এলাকার বাসিন্দা শতাব্দী ত্রিপুরা বলেন,” পারিবারিক কিছু কারণে আমি ওনার (সনজীব বণিক) কাছে স্বর্ণ বন্ধক দিছিলাম। দিয়ে ধাপে ধাপে আমি ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা নিই। আমি ওনাকে এককালীন পরিশোধ করছিলাম ৩ লক্ষ টাকা। এরপরে উনি আবার ফোন দেয়, ফোন দিয়ে ঝামেলা করে টাকার জন্য। ঝামেলা করলে আমি ১ লক্ষ টাকা আবার গিয়ে দিয়ে আসি। দিয়ে আসার পরে উনি তাও না মেনে টাকাগুলো আমাকে ছুঁড়ে মেরে বলে, এই টাকাগুলো নেব না, এগুলো দিয়ে হবে না। এরপরে টাকাগুলো নিয়ে চলে আসার পরে সে অনেকবার ফোন দিয়ে অনেক কিছু গালাগালি করে, অনেকভাবে খারাপ খারাপ আচরণ করে। এরপরে দুই দুই বা তিন মাস ব্যবধানে উনি আমার হাজবেন্ডের নামে মামলা… লিগ্যাল নোটিশ পাঠায়। প্রথমে পাঠাইছিল ২৭ লক্ষ ৫০ হাজার, এরপরে পাঠাইছে ২০ লক্ষ ৫০ হাজার। তো আমার দাবি হচ্ছে যে, সে তো আমাদেরকে এতগুলো অ্যামাউন্টের টাকা দেয় নাই সে আমাদেরকে, কিন্তু না দিয়ে সে এতগুলো বড় অঙ্কের টাকা মামলা কীভাবে করে সে?

চেঙ্গী ব্রীজ সংলগ্ন বলপেলিয়ে আদামের বাসিন্দা মণিকা বিশ্বাস বলেন, ” জায়গার দলিল এবং চেক দিয়ে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা নিছি। নেয়ার পরে সনজীব বণিক আমাদেরকে বলছে ১০ টাকা ধরে সুদ দেয়ার জন্য, আমরা বলছি ওনাকে ৭ টাকা ধরে সুদ দেব। টাকা নেয়ার পরে ৯৫ হাজার টাকা ওনাকে দেয়া হইছে, দেয়ার পরে উনি আমাদেরকে বলতেছে অনেক টাকা পাবে। আমরা ৫০ হাজার ৫০ হাজার করে ১ লাখ টাকা ওনাকে দেব, উনি মানতেছে না।

না মানার পরে ওনা আমাকে আমাদেরকে ৭ লাখ টাকার একটা মামলা দিছে। ৭ লাখ টাকা মামলা দেয়ার পরে ওনার কাছে পায়ে ধরছি, অনেক মিনতি করছি, উনি মানে নাই। আমাদের জায়গাটা বিক্রি করে ওনাকে আমরা ৩ লাখ টাকা দিয়ে দিছি, উনি বলছে কেস উইথড্র করবে। কিন্তু কেসটা তুলে নেয় নাই, ওই জায়গার কাগজটাই দিয়ে দিছে, এখনো কেস তুলে নেয় নাই উনি আমাদের। অনেকে অনেকে কেউ মারাও গেছে। জেল খেটে বের হয়ে মারা গেছে, মিন্টু দাস বলে একজন শান্তিনগর ছিল, ও জেল থেকে বের হয়ে দুই মাস পরে মারা গেছে।”

খাগড়াছড়ি সনাতন কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অশোক মজুমদার বলেন,” সনজীব বণিক বিশেষ করে টাকা দেয় চেকের মাধ্যমে মহিলাদেরকে। যদি ১০০ জনকে দেয়, তার মধ্যে ৮০ জন মহিলা, ওনাদেরকে টাকা দেবে এবং চেক নেবে দুইটা। পরবর্তীতে এই চেকের চেক দিয়ে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে মামলা করবে, ওনাদেরকে হেনস্তা করবে এবং বিভিন্ন ধরনের অপমান অপদস্ত করবে। অন্য প্রকৃতির লোক, খারাপ নেচারের লোক।”

সনজীব বণিক সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,” এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ভিত্তিহীন। এটা বর্তমান খাগড়াছড়ির জেলার জজের কোর্টের মধ্যে মামলা চলতেছে। এটা তারা যদি মিথ্যা যেটা আমার বিরুদ্ধে রটাইতেছে বিভিন্ন জায়গায়, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এটার জন্য আমি কোর্টের মধ্যে তারা প্রমাণ করুক আমিও প্রমাণ করব। মিথ্যা হলে মিথ্যা, সত্য হলে সত্য, কোর্টের মাধ্যমে যেটা রায় হয় সেটা আমি মাথা পেতে নেব।”

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন,” বিষয়টি নিয়ে আমি খোঁজখবর নিব এবং পুলিশকে বলবো অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যারা আছে তাদেরকেও বিষয়টি খোঁজ নেওয়ার জন্য আমি নির্দেশনা প্রদান করব। যদি প্রকৃতই কেউ ভুক্তভোগী থাকে,আইনের মাধ্যমে সেভাবে আমরা সমাধান করার চেষ্টা করব।পাশাপাশি যারা হয়রানির শিকার হচ্ছে তারা যদি আইনের মাধ্যমে কোন সহায়তা চাই সেটা আমরা করব।”