গত কয়েক বছর নিয়মিতভাবে তিন পার্বত্য জেলাবাসীকে বন্যায় তলিয়ে যেতে হচ্ছে। খাগড়াছড়ি আর রাঙ্গামাটিতে বৃস্টির পানি বিভিন্ন খাল, বিল, ঝিড়ি, ঝর্না ও নদী হয়ে কাপ্তাই বাঁধে গিয়ে জড়ো হয়। সেই পানি কর্নফুলি নদী দিয়ে প্রবাহিত হতে পারলে চট্টগ্রাম বঙ্গোপসাগরে মোহনা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু কাপ্তাই বাঁধের কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে পানি ছাড়ে না।

এদিকে বাধেঁর উপড় দিকে চেঙ্গি, মাইনিং, কাচালাং নদীগুলোতে পলিমাটি জমে নদীর গভীরতা কমে গেছে৷ ব্যাপক বালু উত্তোলনের কারনেও নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা তেমন বাড়ছে না। নদীর দুই পাড়ে ব্লক বসিয়ে ভাঙ্গন রোধ করা হলেও দুইদিনের টানা বৃস্টির পানিকে ধারন করে রাখার মতো ক্ষমতা নদীগুলো হারিয়েছে৷ এসব কারনে কি বন্যা অবধারিত?

খাগড়াছড়ি পৌরসভা বা জেলা পরিষদের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পানি নিস্কাশন প্রকল্পগুলোকে এমনভাবে সাইজ ছোট করে ড্রনগুলো এস্টিমেট করা হয়েছে, যা মহাপ্রকৌশলির বদৌলতে পাহাড়ের বৃস্টির পানি আর নদীতে দ্রুত যেতে পারে না। ২৪ সালে পাহাড়ের পানিঢল এসে এই শহরে কিভাবে বন্যার ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃস্টি হলো সেটা নিজ চোখে দেখলাম। প্রচুর সরকারি বেসরকারি ত্রান দিয়ে ভুক্তভোগীকে সহযোগীতা করতে হয়েছে৷ কিন্তু পরের বছর এ ব্যাপারে আর কোন আলোচনা হয় নি। এক বছর বাদে ২৬ সালে জুলাই এ এসে দেখলাম আরো ভয়াবহ রুপে বন্যা চলে আসছে৷

বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম ও তিন পার্বত্য জেলা মিলে পাহাড়ধসে ৪০ জন লোক নিহত হয়েছে। এদিকে সাজেক পর্যটনে ৪ শতাধিক পর্যটক আটকে যায়। বান্দরবানে পর্যটন রিসোর্ট হোটেলগুলোকে বন্ধ করে রাখতে প্রশাসন নির্দেশ দিয়েছে।

আমরা আগে ভাবতাম ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, ফেনীসহ পুরো বাংলাদেশ বন্যায় ভেসে গেলেও পাহাড়ে অনেক ভালো আছি। সাঙ্গু, কর্ণফুলী, হালদা, ফেনী নদী দিয়ে পাহাড়ের পানি প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় পৌঁছে গেলে আমরা বেঁচে যায়। সমতলবাসীকে এক প্রকার করুনা করতাম তখন। পাহাড়ে যাদেরকে সেটেলার বলা হয় তারা সমতল থেকে পাহাড়ে এসে হয়ত ভেবেছিল আর কখনো বন্যার পানিতে ভেসে যেতে হবে না। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সে বাস্তবতা পাহাড়ে আর নাই। এখানে সুউচ্চ থানচি আর রুমার মতো পাহাড়ি এলাকায়ও বন্যা হচ্ছে। নিচু এলাকা দিঘীনালা, খাগড়াছড়ি সদর, মাটিরাংগা মতো উপজেলাগুলোও পানির নীচে তলিয়ে যাচ্ছে। এ বছর দিঘীনালার মেরুং ইউনিয়ন একেবারে পানির নীচে ডুবে গেছে।

মজার বিষয়, পাহাড়ী আর বাঙালির মধ্যে মারামারি ঘটনা হলে দুই পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে চলে যায় কিন্তু বন্যা হলে তখন আর একে অপরকে দোষারোপ করার সুযোগ থাকে না। যে ত্রান নিয়ে যায় তাকে ভাবতে হয় যে, যেন সব পক্ষের মাঝে বিতরন হয়৷ কারন প্রকৃতির কাছে এই বিভাজিত লোকগুলোও সমানভাবে অসহায়।

খাগড়াছড়ি শহরে চেঙ্গি নদীটা মায়ের মতো সবাইকে বুকে নিয়ে দীর্ঘকাল প্রবাহমান ছিল, কিন্তু গত ১০/১৫ বছর ধরে এ নদী তার জনবসতীদের কাছে নিষ্ঠুরতার করুন কাহিনী হয়ে উঠেছে৷ এ শহরে এখন নিয়মিত বন্যা হচ্ছে। বিশেষ করে উপজেলা সদর হাটবাজারকে পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর উন্নয়নের নামে পানি প্রবাহের জন্য অনেকগুলো ছোট ছোট ড্রেন খনন করা হয়েছে, যেগুলো বর্তমানে বৃস্টির পানি প্রবাহের জন্য বাধা হিসেবে দাড়াচ্ছে। মানুষ চলাচলের জন্য বড় রাস্তা রাখা হয়েছে কিন্তু যেহেতু বছরে তিনমাস বৃস্টি থাকে তাই পানি চলাচলের সরু ড্রেন করলে সমস্যা কি? হয়ত টেন্ডারবাজরা এরকম ভেবেছিল কিন্তু জনতার অভিশাপ এখন নিয়মিত শুনতে হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি শহরে সেলিম মার্কটটি এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে পূর্বদিকের খালকে দখল করে একদম বাঁকা করে ফেলল। ফলে পানি দ্রুত বের হয়ে চেঙ্গি নদীতে পৌঁছাতে দেরি হয়। এদিকে চেঙ্গি নদীর পাড়ে যে ব্লকগুলো বসানো হলো সেটাও উপড় থেকে আসা পানিকে ধারন করতে সক্ষম না, কারন চেঙ্গী নদীতে দীর্ঘদিন ধরে পলিমাটি জমে গভীরতা কমে গেছে। নিয়মিত বালু উত্তোলনের কারনেও তলের গভীরতা কমে গেলে বর্ষার পানি উপড় থেকে ঢেয়ে আসলে পাড় ভেঙ্গে গ্রামের ভিতরে চলে যায় তখন শহরের আশেপাশে গ্রামগুলো পানিতে ভেসে যায়। মানুষের পক্ষে তখন তিন মাস না তিন মিনিটও পানিতে ভেসে থাকা সম্ভব না।

প্রশ্ন হলো সরকারি উন্নয়নের ভুল ধারনা আর বন্যার সাথে লড়াইরত জনগণের ভবিষ্যত কি? যেসব জনপ্রতিনিধি ছিল তারা কেউ পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ছিল না। তাহলে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব কি? বিশেষ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পগুলোর কাজে দুর্নীতি যেমন ব্যাপক হয তেমনি বড় অপচয়ের কারনে জনগনের জন্য ক্ষতিকর দিকগুলো হিসাব করে দেখা হয় না৷ এদেশে তো এমন আইন নাই যে, প্রকল্পের কারনে মানুষের ক্ষতি হলে সেজন্য পূর্ববর্তী ঠিকাদার বা সংশ্লিস্ট ব্যক্তিকে শাস্তি পেতে হয়েছে। এমন নজিড় কিন্তু নাই। ফলে দৃর্বৃত্তরা সরকারকে ফাঁকি দিয়ে নিয়মিত জনদুর্ভোগ প্রক্ল্প দিয়ে নদীর পাড়ের লোকজনকে ভোগাতে থাকবে।

খাগড়াছড়ি চেঙ্গী নদীর তীরে পাড়ে মানুষগুলো স্বাবলম্বী হলেও দান দক্ষিনা নেওয়ার মতো সমাজের বিভিন্ন নেতা, সংগঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ৫/১০ কেজি চাউল, ডাল, তেলের দিকে চেয়ে থাকতে হয়। অথচ পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থা হলে এ দুর্ভোগ থেকে মানুষ বেঁচে যেতো। বৃষ্টির পরিমান যত বেশি হোক পাহাড়ের পানি আটকে থাকবে কেন? মানুষের আত্মমর্যাদায় আঘাত হলেও এ সমস্যা ব্যাপারে কোন এনজিও বা রাজনৈতিক সংগঠনের কোন উচ্চবাচ্য নাই। ইতিমধ্যে তিন জেলায় পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে পার্বত্য মন্ত্রনালয় থেকে বন্যা দুর্গতদের জন্য ১৫০০ টন চাউল বিতরন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনও তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কি?

আরেকটা বিষয় দেখুন, যেসব নদীগুলো কাপ্তাই বাঁধের সাথে যুক্ত হয়েছে, সেসব নদীগুলোর পানি প্রবাহ কমে গেছে৷ নদীতে পলি ভরাট ছাড়াও নীচের দিকে নদীর পাড়গুলো দখল হয়ে গেছে৷ এই মুহুর্তে কাপ্তাই বাঁধে পানি উপচে পড়ে নাই। তাহলে উপড়ের দিকে নদীর পাড়ে মানুষগুলো পানিতে আটকে যাচ্ছে কেন? কারন নদীগুলোর মোহনা বা কাপ্তাই বাঁধের সংযোগস্থলে বিভিন্নভাবে দখল বেদখলের কারনে পানি নীচের দিকে সহজে নামতে পারছে না।

অন্যদিকে মুল কাপ্তাই বাঁধে পানি নিষ্কাশন পদ্ধতিতেও অমানবিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। উপড়ে গ্রামবাসী পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বাঁধের পানি নিস্কাশন হচ্ছেনা। তার মানে যেসব জায়গায় বন্যা হচ্ছে, সেজন্য কাপ্তাই বাঁধের পানি নিস্কাশনের পদ্ধতি কি দায়ী না? এদিকে প্রকল্পটি যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল সেটার বাস্তব সুবিধাও পাহাড়বাসী পাই নি৷ সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে জমা হলে সেটা সারাদেশ ভোগ করে৷ অথচ পাহাড়ে ১০০% বিদ্যুৎও হলো না, তেমনি এত বড় বাঁধের অব্যবস্থাপনার কারনে নদীর পাশের উপজেলাগুলোকে নিয়মিত বন্যার সাথে লড়াই করতে হচ্ছে। পূ্র্বে কাপ্তাই বাঁধের উপড়ে বন্যা না হলেও এখন কেন হচ্ছে? বৃস্টির পরিমান বেশি হওয়ার কারনে? নাকি পানি নিষ্কাশনের সুযোগ না থাকার কারনে।

এদিকে বান্দরবানের নদীগুলোতে কিন্তু পানি প্রবাহের সমস্যা নাই। কারন সেখানকার পানিগুলো আটকাতে দানবীয় কাপ্তাই বাঁধ নাই। কিন্তু বৃস্টির পানি ধরে রাখার মতো পাহাড়ের মাটিতে সে সক্ষমতা আগের মতো নাই, সেটা পাহাড়ের বুকে বন্যার ঢেউ দেখে বুঝা যায়। কারন পাহাড়ের গাছগুলো নির্বিচারে কেটে ফেলা হয়েছে। কম দামে গাছ কেটে ব্যবসা করে অনেক সমতলবাসী গাড়ি, বাড়ি মালিক হয়েছে৷ তারা পাহাড়কে গাছশুন্য করে টাকাওয়ালা হলেও পাহাড়কে নিয়ে কোন ভাবনা থাকার কথা না।

সামাজিক মিডিয়ায় থানচি এক পাড়াবাসীকে বলতে শোনা যায়, আমাদের চাউল ভাত লাগবে না। কিন্তু বাচ্চাদের কে বাঁচাতে কোন আশ্রয়কেন্দ্রে রাখতে হবে। তাহলে পাহাড়ধস, পর্বতের মাটি পানি ধরে রাখতে না পারা, নির্বিচারে গাছ কাটা ইত্যাদি কারনে বৃষ্টির পানি যখন তীব্র শক্তি নিয়ে নীচে নেমে আসে তখন কোন পাড়া বা গ্রামে আটকে গেলে সেটা নিষ্কাশনের দ্রুত ব্যবস্থা না থাকায় এমন দুর্ভোগের বন্যা সৃস্টি হচ্ছে বলে প্রতীয়মান। এদিকে চেঙ্গী, মাইনিং মতো সাঙ্গু, মাতামুহুরিতেও পলি মাটি ভরাটের কারনে পানির প্রবাহ কমে গেলে নীচের দিকে বা সমুদ্রের দিকে দ্রুত যেতে পারে না। সমুদ্রের পানির পরিমানও প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুহুড়ি ঘাটের মতো সমুদ্রের মুখে বেরিবাঁধগুলোও পানি চলাচলে বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে কিনা। এসব বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা উচিত। তার মানে সারা বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের কারনেও পাহাড়ের পানি সমুদ্রে গিয়ে দ্রুত মোহনা করতে পারে না।

চট্টগ্রাম শহরকে এখন জলাবদ্ধতা মুক্ত করার জন্য সরকার কার্যকর কোন প্রকল্প নিতে পারছে না।। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম ক্ষেত্রে এখনো সময় আছে। জেনে রাখুন পাহাড়ের ভিতরে নীচের অংশে এমন কতগুলো ছোট ছোট পাড়া আছে যেসব পাড়াগুলো চারিদিকে বড় বড় পাহাড় বেস্টিত। পাশের বড় পাহাড়টি ধসে পড়লে পুরো পাড়াটি মাটির নীচে চাপা পড়ে যাবে। তখন কে কাকে দোষ দিবে? উদ্ধার করতে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট সরকার চাইলেও পৌঁছাতে পারবে না।

আমার এ কথা শুনে অনেকে যুক্তি দিবে সেখানে তো পাথর আছে৷ সহজে ধসে পড়বে না। কিন্তু পাথর বিভিন্নভাবে চুরি হয়ে যাচ্ছে। আর পাহাড়ের চুড়ায় তো এখন আগের মতো গাছ নাই। “ন্যাড়া পাহাড়” বলে কথাটি প্রচলন হয়ে গেছে। ব্যাপক গাছ রোপন করে বন সৃস্টি করতে না করলে উপড়ের মাটি তো ধসে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে আম বাগান করতে গিয়ে দিকে উঁচু পাহাড়গুলো ভেঙ্গে পড়েছে। বাগানের গাছের মুল মাটির গভীরে না যাওয়ায় পাহাড়ধসের মতো ঘটনা ঘটে।

সেসব বড় আকারে হয়নি বলে তেমন আলোচনা নাই। তাই বড় পরিকল্পনা না নিলে সামনে মহা বিপদ আছে। মানুষে মানুষে দ্বন্দ বিবাদ করে তো অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। এবার প্রকৃতি নিয়মিত প্রতিশোধ নিচ্ছে এর থেকে পরিত্রাণ উপায় দ্রুত খোঁজা উচিত। এভাবে প্রতি বছর বৃষ্টির পানি বাড়তে থাকলে ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পাবে, মানুষজন নানা সমস্যায় নিমজ্জিত হতে থাকবে।

ইতিমধ্যে দেখলাম, বান্দরবানের মাননীয় এমপি সাচিংপ্রু জেরি পাহাড়ের পানি সমস্যা সমাধান করতে তিনি ভুগর্ভস্থ পানিকে কিভাবে উত্তোলন করে পাহাড়ের উপড়ে বসবাসকারি লোকজনকে বিতরন করে সমতলবাসীকেও দেওয়া যায় সে ব্যাপারে সংসদে কথা বলেছেন। কারন গরমকালে পানির অভাবে পাহাড়ের উপড়ে লোকজনকে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু এখন বৃষ্টির পানিকে কি ধরনের উন্নত ব্যবস্থাপনা করলে পাহাড়ের লোকজন বন্যার সমস্যা থেকে মুক্তি পাবে সে ব্যাপারে জোড়ালো প্রস্তাব পাহাড়ের মাননীয় চার এমপি সংসদে উত্থাপন করা উচিত। নাহলে প্রতি বছর পাহাড়বাসীকে পানিতে ডুবে কস্ট পেতে হবে।

উশ্যেপ্রু মারমা,লেখক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, গুইমারা,খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা।